২৩ মে, ২০১৪

কুরানে বিগ্যান (পর্ব-৩৭): বদর যুদ্ধ- ৮: লুঠ ও মুক্তিপণের আয়ে জীবিকাবৃত্তি ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – দশ

লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১ > পর্ব ১২ > পর্ব ১৩ > পর্ব ১৪ > পর্ব ১৫ > পর্ব ১৬ > পর্ব ১৭ > পর্ব ১৮ > পর্ব ১৯ > পর্ব ২০ > পর্ব ২১ > পর্ব ২২ > পর্ব ২৩ > পর্ব ২৪ > পর্ব ২৫ > পর্ব ২৬ > পর্ব ২৭ > পর্ব ২৮ > পর্ব ২৯ > পর্ব ৩০ > পর্ব ৩১ > পর্ব ৩২ > পর্ব ৩৩ > পর্ব ৩৪ > পর্ব ৩৫ > পর্ব ৩৬

স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নেতৃত্বে বদর যুদ্ধে মুহাম্মদ অনুসারীরা তাদেরই একান্ত নিকটাত্মীয়, পরিবার ও প্রতিবেশী ৭০ জন কুরাইশকে নৃশংসভাবে খুন করার পর লাশগুলোকে চরম অবমাননা ও অশ্রদ্ধায় বদর প্রান্তের এক নোংরা শুষ্ক গর্তে একে একে নিক্ষেপ করেন (পর্ব ৩২-৩৩)। লাশগুলো গর্তে নিক্ষেপ করার পর আল্লাহর নবী কুরাইশদের কাছ থেকে প্রাপ্ত লুণ্ঠন সামগ্রী ভাগাভাগির ব্যবস্থা করেন। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে যে, মুহাম্মদের নেতৃত্বে তাঁর অনুসারীরা বদর প্রান্তে জড়ো হয়েছিলেন আবু-সুফিয়ানের নেতৃত্বে সিরিয়া থেকে আগমনকারী কুরাইশদের এক বিশাল বাণিজ্য বহরে অতর্কিত হামলা (ডাকাতি) করে তাঁদের সমস্ত মালামাল লুণ্ঠন এবং সম্ভব হলে কাফেলা আরোহীদের বন্দী করে নিয়ে এসে তাঁদের আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের লাভজনক জীবিকা অর্জনের অভিপ্রায়ে (পর্ব-৩০)। বদর প্রান্তে পৌঁছার পূর্বে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা জানতেন না যে, তাঁদের হামলার খবর পেয়ে আবু-সুফিয়ান মক্কার কুরাইশদের আহ্বান করেছেন যেন তারা তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসে। মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা ধারণা করেছিলেন যে, তাঁরা এই লুণ্ঠন কর্মটি অতি সহজেই সমাধা করে লুন্ঠনকৃত মালামাল নিয়ে মদিনায় ফিরে যেতে পারবেন। বিশেষ করে তাঁদের এই অভিযানে মুহাজিরদের সাথে আনসাররাও জড়িত থাকায় অন্যান্য লুণ্ঠন অভিযানের তুলনায় এ যাত্রায় তাঁরা ছিলেন দলে ভারী। তাই এ ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন বেশ নিশ্চিত। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল মক্কাবাসী কুরাইশদের সাথে তাঁদের নৃশংস সংঘর্ষ, রক্তপাত ও জয়লাভ। আর এই জয়লাভের পর কুরাইশদের মালামাল লুণ্ঠন। পরিশেষে লুণ্ঠনকৃত মালামাল ভাগাভাগি!

কিন্তু এই লুণ্ঠন-কৃত মালামাল ভাগাভাগির প্রাক্কালে তাঁদের মধ্যে বাঁধলো বিরোধ। আর এই বিরোধ মীমাংসার জন্য মুহাম্মদ যথারীতি আপ্তবাক্য (ঐশী বাণী) নাজিল করলেন।

লুটের মাল ভাগাভাগি- "তারা আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, গনিমতের হুকুম---"

আদি মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় ঘটনাটি ছিলো নিম্নরূপ:

‘তারপর [লাশগুলো গর্তে ফেলার পর] আল্লাহর নবী আদেশ করলেন যে কুরাইশদের ক্যাম্প থেকে যা কিছু সংগ্রহীত হয়েছে, তা যেন একত্রিত করা হয়, মুসলমানেরা তাতে কলহে লিপ্ত হয়। যে যা সংগ্রহ করেছিলেন, তাঁরা সেটা তাঁর নিজের বলে দাবি করেন।

যারা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদেরকে খুন বা পরাস্ত করেছিলেন, তাঁরা বলেন, "আমরা যদি তা না করতাম তবে তোমরা এগুলো নিতে পারতে না। আমরা তোমাদের কাছ থেকে শত্রুদের বিভ্রান্ত করেছিলাম বলেই এ গুলো [তোমরা] নিতে পেরেছ।"

আল্লাহর নবী আক্রান্ত হতে পারেন - এই আশংকায় যাঁরা তাঁর রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন তাঁরা বলেন, "আল্লাহর কসম, এই সম্পদে তোমাদের অধিকার আমাদের অধিকারের চেয়ে বেশি নয়। আল্লাহর দেয়া সুযোগে আমরা শত্রু নিধন চেয়েছিলাম এবং তাদেরকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিলাম; [তোমাদের মত] আমরাও চেয়েছিলাম অরক্ষিত সম্পদ হস্তগত করতে কিন্তু আমাদের আশংকা ছিল যে, শত্রুরা পুনরায় ফিরে এসে আক্রমণ করতে পারে। তাই আমরা তাঁর [মুহাম্মদের] প্রহরায় ছিলাম; এই লুটের মালে (Booty) তোমাদের অধিকার আমাদের অধিকারের চেয়ে বেশি নয়।"

ইবনে হুমায়েদ < সালামাহ < মুহাম্মদ ইবনে ইশাক < আবদ আল রাহমান বিন আল হারিথ এবং আমাদের অন্যান্য সঙ্গীরা < সুলাইমান বিন মুসা আল আসদাক < মাখুল < আবু উমামা আল বাহিলি বলেছেন,

"আমি উবাদা বিন আল সামিত কে ‘আল আনফাল অধ্যায় [সুরা নম্বর ৮]' সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছেন যে, বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা যখন লুটের মাল নিয়ে বিবাদ করছিলেন এবং তাদের দুষ্ট প্রকৃতি প্রদর্শন করছিলেন তখন তা নাজিল হয়েছিল। আল্লাহ তা [লুন্ঠন সামগ্রী] তাঁদের হাত থেকে নিয়ে নবীকে দেন এবং আল্লাহর নবী তা সমস্ত মুসলমানদের মধ্যে সমভাবে ভাগ করে দেন।"

৮:১ – “তারা আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, গনিমতের হুকুম। বলে দিন, গণিমতের মাল হল আল্লাহর এবং রসূলের। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং নিজেদের অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের হুকুম মান্য কর, যদি ঈমানদার হয়ে থাক।"’ [1]

বন্দী স্বজনদের মুক্তিপণের দায় এবং মৃত স্বজনদের জন্য কুরাইশদের বিলাপ:

‘ইয়াহিয়া বিন আববাদ বিন আবদ আল্লাহ বিন আল-জুবায়ের তার পিতা আববাদ
থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাকে [ইবনে ইশাক] বলেছেন যে, কুরাইশরা তাঁদের মৃত স্বজনদের জন্য যখন বিলাপ করছিলেন, তখন বলেন:

"এটা করো না। কারণ মুহাম্মদ ও তার সহচররা যখন এ [বিলাপের] ঘটনা জানবে, তখন তারা আমাদের দুরবস্থায় আনন্দিত হবে। তোমাদের বন্দী স্বজনদের মুক্তির ব্যাপারে তাদের কাছে কোন বার্তাবহ না পাঠিয়ে বরং অপেক্ষা করো, যাতে মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা অত্যধিক মুক্তিপণ দাবি না করে।"

আল-আসওয়াদ বিন আল-মুত্তালিব তাঁর তিন ছেলেকে হারিয়েছিলেন: জামাহ, আকিল এবং আল-হারিথ বিন জামাহ। তিনি তাদের জন্য বিলাপ করতে চাচ্ছিলেন। [2]

বন্দি আবু আজিজ বিন উমায়ের বিন হাশিমের মুক্তিপণ:

আবু আজিজের মা জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, কুরাইশ বন্দিদের মুক্ত করতে সর্বোচ্চ কত টাকা মুক্তিপণ লেগেছে। যখন তাঁকে বলা হয় যে, তা ছিল ৪,০০০ দিরহাম তখন তিনি সেই পরিমাণ টাকা পরিশোধ করে তাকে মুক্ত করেন। [3]

>>> পাঠক, এই সেই আবু আজিজ বিন উমায়ের বিন হাশিম, যিনি বলেছিলেন, 

"একজন আনসার আমাকে বেঁধে ফেলার সময় আমার ভাই মুসাব আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। সে [মুসাব] বলে, 'তাঁকে শক্ত করে বাঁধো, কারণ তার মা খুবই সম্পদশালী মহিলা, সম্ভবত সে মুক্তিপণের মাধ্যমে তোমার কাছ থেকে তাকে মুক্ত করাবে।”’[পর্ব -৩৫]

বন্দি আবু ওয়াদা বিন দুবায়েরা আল-সাহমি

‘বন্দীদের মধ্যে ছিলেন আবু ওয়াদা বিন দুবায়েরা আল-সাহমি। আল্লাহর নবী মন্তব্য করেন যে, মক্কায় তার এক বিচক্ষণ ও সম্পদশালী ছেলে আছে, হয়তো সে শীঘ্রই তার পিতাকে মুক্তি পণের বিনিময়ে ছাড়িয়ে নিতে আসবে।

অত্যধিক মুক্তিপণের পাল্লায় যেন না পড়তে হয়, সেই কারণে যখন কুরাইশরা মুক্তিপণ নিয়ে এগিয়ে আসতে বিলম্ব করার মনোভাব পোষণ করেছিলেন, তখন আল মুত্তালিব বিন আবু ওয়াদা, আল্লাহর নবী যার সম্বন্ধে বলছিলেন, বলেন, "তোমরা ঠিকই বলেছ। তাড়াহুড়া করো না।" তারপর এক রাতে তিনি হঠাৎ মদিনা এসে ৪,০০০ দিরহাম বিনিময়ে তাঁর পিতাকে মুক্ত করে নিয়ে যান।’ [4]

বন্দি সুহায়েল বিন আমর

‘কুরাইশরা বন্দি স্বজনদের মুক্ত করতে মুক্তিপণ পাঠায় এবং মালিক বিন আল দুখসুমের হাতে বন্দি সুহায়েল বিন আমরকে মুক্ত করতে আসে মিকরাজ বিন হাফস বিন আখিয়াফ। সুহায়েল ছিল সেই লোক যার নিচের ঠোঁট ফেটে ভাগ হয়ে গিয়েছিল।

মুহাম্মদ বিন আমর বিন আতা আমাকে [মুহাম্মদ ইবনে ইশাক] বলেছেন যে, উমর আল্লাহর নবীকে বলেন, "আমাকে সুহায়েলের সামনের দুইটি দাঁত উপড়ে ফেলার অনুমতি দিন; তাহলে তার জিহ্বা বেড়িয়ে পড়বে এবং সে কখনোই আপনার বিরুদ্ধে কিছু বলতে পারবে না।" তিনি জবাবে বলেন, "আমি তাকে বিকলাঙ্গ করবো না, তাহলে যদিও আমি নবী আল্লাহ আমাকে বিকলাঙ্গ করবে।" আমি শুনেছি যে আল্লাহর নবী উমরকে এই হাদিসে বলেন, "সম্ভবত সে এমন কাজ করবে যাতে তুমি নিন্দার কিছু পাবে না।"

যখন মিকরাজ তার (সুহায়েল) বিষয়ে কথা বলেন এবং পরিশেষে তাদের শর্তে রাজি হন, তাঁরা [মুসলমানরা] বলেন, "আমাদের পাওনা বাকি টাকা পরিশোধ করো।"

জবাবে তিনি [মিকরাজ] বলেন, "তার পরিবর্তে আমার পায়ে শৃঙ্খল পরাও এবং তাকে ছেড়ে দাও যেন সে তোমাদের কাছে তার মুক্তিপণের টাকা পাঠাতে পারে।"

তাই তাঁরা সুহায়েল কে ছেড়ে দেয় এবং তার পরিবর্তে মিকরাজ কে বন্দি করে।’ [5] 

আবু সুফিয়ান বিন হারবের ছেলে আমর বিন আবু সুফিয়ান কে বন্দি

‘[ইবনে হুমায়েদ < সালামাহ বিন আল-ফাদল <] মুহাম্মদ ইবনে ইশাক < আবদুল্লাহ বিন আবু বকর বিন মুহাম্মদ বিন আমর বিন হাজম:

আল্লাহর নবীর কাছে বন্দী ছিলেন আমর বিন আবু সুফিয়ান বিন হারব (বদর যুদ্ধে আলী তাকে বন্দী করেন), যাঁর বিয়ে হয়েছিল উকাবাহ বিন আবু মুয়াতের কন্যার সাথে। যখন আবু সুফিয়ানকে তাঁর ছেলে আমরের মুক্তির জন্য মুক্তিপণের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়,

তিনি বলেন, "আমাকে কি খুন ও বন্দীজনিত দ্বিগুণ ক্ষতির ভোগান্তি পোহাতে হবে? তারা খুন করেছে [আমার এক ছেলে] হানজালাকে এবং [আরেক ছেলে] আমরের মুক্তির জন্য আমাকে দিতে হবে মুক্তিপণ? তাকে তাদের কাছেই থাকতে দাও। যত দিন ইচ্ছা তত দিন তারা তাকে ধরে রাখুক।"

যখন তিনি [আমর] এমনি ভাবে মদিনায় আল্লাহর নবীর কাছে বন্দী ছিলেন, বানু আমর বিন আউফের ভাই সা'দ বিন আল নুমান বিন আখাল তার কম বয়সী স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মক্কায় তীর্থযাত্রী হন। তিনি ছিলেন একজন বৃদ্ধ মুসলমান, যাঁর ভেড়াগুলো ছিল আল-নাকিতে (মদিনার নিকটবর্তী একটি স্থান)। অনভিপ্রেত কোন বিপদের আশংকা না করে তিনি সেখান থেকেই তীর্থযাত্রা করেছিলেন। যেহেতু তিনি তীর্থযাত্রায় মক্কায় এসেছেন, তাই তিনি কখনো চিন্তাও করেননি যে, মক্কায় তাঁকে কেউ আটকে রাখবে। কারণ তিনি জানেন যে, কুরাইশরা তীর্থযাত্রীর সাথে খুব ভাল ব্যবহার করে এবং তীর্থযাত্রী কোন কাজে সাধারণত: নাক গলায় না। কিন্তু আবু সুফিয়ান মক্কায় তাঁর ওপর চড়াও হন এবং তাঁর ছেলে আমরের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য তাঁকে বন্দী করেন।

তখন বানু আমর বিন আউফ গোত্রের লোকেরা আল্লাহর নবীর কাছে যান ও এই ঘটনাটি [তাঁকে] অবহিত করান এবং অনুরোধ করেন যে, তিনি যেন আমর বিন আবু সুফিয়ানকে ফিরিয়ে দেন, যাতে তাদের এই লোককে [সা'দ বিন আল নুমান] তারা আমরের পরিবর্তে মুক্ত করে। আল্লাহর নবী রাজি হন। তাই তাঁরা আমরকে আবু সুফিয়ানের কাছে ফেরত দেন এবং আবু সুফিয়ান মুক্তি দেন সা'দ কে।’ [6]

>>> বদর প্রান্তে (মার্চ, ৬২৪ সাল) মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা অন্যান্য কুরাইশদের সাথে পানিবঞ্চিত অবস্থায় প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতায় হানজালা বিন আবু সুফিয়ানকে খুন এবং আমর বিন আবু সুফিয়ানকে বন্দী করে ইসলাম নামক "রক্তাক্ত তরবারির ইতিহাস" এর সূচনা করেন। এই রক্তাক্ত ইতিহাসেরই ধারাবাহিকতায় হানজালা বিন আবু সুফিয়ান ও আমর বিন আবু সুফিয়ানেরই ভাই মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান এই ঘটনার ঠিক ছেচল্লিশ বছর পর ৬৭০ সালের মার্চ মাসে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন এই মুহাম্মদেরই প্রাণপ্রিয় জ্যেষ্ঠ দৌহিত্র হাসান বিন আলী বিন আবু তালিবকে। এই সেই হানজালা বিন আবু সুফিয়ান ও আমর বিন আবু সুফিয়ান যার ভাতিজা ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানের সৈন্যরা এই ঘটনার ঠিক সাড়ে ছাপ্পান্ন বছর পর ৬৮০ সালের অক্টোবর মাসে প্রচণ্ড নিষ্ঠুরতায় পানিবঞ্চিত, তৃষ্ণার্ত ও পিপাসিত অবস্থায় কারবালা প্রান্তরে একে একে নৃশংসভাবে খুন করেন এই মুহাম্মদেরই আর এক দৌহিত্র হুসেইন বিন আলী বিন আবু তালিব এবং তাঁর পরিবার সদস্য ও সহযাত্রীদের (পর্ব-৩২)।

বদর প্রান্তে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যে প্রতিহিংসা ও রক্তাক্ত তরবারির ইতিহাসের সূচনা করেছিলেন, তার জের চলছে আজও! মুহাম্মদ বিন আবদ-আল্লাহর আবিষ্কৃত ধর্মবিশ্বাস (Cult) নামক এই ঘৃণা, হিংসা, সন্ত্রাস, বিভেদ ও আধিপত্য বিস্তারের মতবাদ প্রচার ও প্রসারের প্রত্যক্ষ বলী হয়ে জীবন দিতে হয়েছে আনুমানিক প্রায় ২৭ কোটি (২৭০ মিলিয়ন) অবিশ্বাসী কাফেরকে! শুধু ভারতবর্ষেই যার সংখ্যা নয় কোটি: ৮ কোটি হিন্দু ও ১ কোটি বৌদ্ধ। আফ্রিকায় ১২ কোটি। খ্রিষ্টান ৬ কোটি ও কয়েক হাজার ইহুদি। আর মুসলমান? ঠিক কত জন মুসলমান এই ইতিহাসের বলী হয়েছেন, তার কোনো সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। ধারণা করা হয় যে, এই রক্তাক্ত ইতিহাসের বলী মুসলমানদের সংখ্যা অমুসলমানদের চেয়ে অনেক বেশি। আজকের পৃথিবীর দিকে তাকালে সেই একই দৃশ্য আমরা দেখতে পাই। মুসলমানদের হাতে যত অমুসলমান নিধন হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি মুসলমান নিধন হয় তাঁদের নিজেদের মধ্যেই খুনাখুনি ও বিবাদের কারণে। [7] 

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি। - অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ - লেখক।]

The Division of the booty – “They will ask you about the spoils-”

‘Then the apostle ordered that everything that had been collected in the camp should be brought together, and the Muslims quarreled about it. 

Those who had collected it claimed it, and those who had fought and pursued the enemy said, “If it had not been for us you would not have taken it.  We distracted the enemy from you so that you could take what you took.” 

Those who were guarding the messenger of God for fear that enemy would attack him said, “By God, you have no better right to it than we have. We wanted to kill the enemy when God gave us the opportunity and made them turn there backs, and we wanted to take property when there was no one to protect it; but we were afraid that the enmy might return and attack, so we remained standing before him; you have no better right to booty than we have.”

According to [Ibn Humayd < Salamah <] Muhammad b Ishaq < Abd al-rahman b al-Harith and other companioins of ours < Sulayman b Musa al-Ashdaq from <Makhul < from Abu Umama al-Bahili said, “I asked Ubada b al-Samit about the chapter of al-Anfal and he said that it came down concerning those who took part in the battle of Badr when they quarreled about the booty and showed their evil nature.  God took it out of their hands and gave it to the apostle, and he divided it equally among the Muslims.’” --

Q: 8:1-- “They will ask you about the spoils, say, the spoils belong to God and the apostle, so fear God and be at peace with one another and obey God and His apostle if you are believers.” [1]

Liability of Ransom of Captives and bewailing dead relatives of Quraysh:

‘Yahya bin Abbad b Abd Allah b Al-Zubayr from his father Abbad told me [Ibn Ishaq] that Quraysh bewailed their dead.  Then they said, “Do not do this, for the news will reach Muhammad and his companions and they will rejoice over your misfortune; and do not send messengers about your captives but hold back so that Muhammad and his companions may not demand excessive ransoms.” 

Al-Aswad b al-Muttalib had lost three of his sons: Zama’a, Aqil and Al-Harith b Zama’a and he wanted to bewail them.’ [2]

Abu Wada’a b Dubayra al-Sahmi

‘Among the prisoners was Abu Wada’s b Dubayra al-Sahmit. The apostle remarked that in Mecca he had a son who was a shrewed and rich merchant and that he would soon come to redeem his father. When Quraysh counseled delay in redeeming the prisoners so that the ransom should not be extortionate al-Muttalib b Abu Wada’a, the man the apostle meant, said, “You are right, don’t be in a hurry.”  And he slipped away at night and came to Medina and recovered his father for 4,000 dirhams and took him away.’ [4]

Suhayl b Amr

‘Then Quraysh sent to redeem the prisoners and Mikraz b Hafs b al-Akhhyaf came about Suhayl b Amr who had been captured by Malik b al-Dukhshum.  Suhayl was a man whose lower lip was split. 

Muhammad b Amr b Ata told me [Ibn Ishaq] that Umar said to the apostle, “Let me pull out Suhayl’s two front teeth; his tongue will stick out and he will never be able to speak against you again.” He answered, “I will not mutilate him, otherwise God would mutilate me though I am a prophet.” I have heard that the messenger of God said to Umar in this hadith, “Perhaps he will play a role which you will not find blameworthy.”

When Mikraz had spoken about him and finally agreed on terms with them, they said, “Give us what is due to us.” 

He replied, “Fetter my foot instead of his and let him go, so that he can send you his ransom.” 

So they let Suhayl go and imprisoned Mikraz in his place. [5]

Amr b Abu Sufyan b Harb

‘According to Ibn Humayd from Salamah b al-Fadl from Muhammad bin Ishaq from Abdullah b Abu Bakr b Muhammad b Amr b Hazm:

Amr b Abu Sufyan b harb, who was married to the daughter of Uqbah b Abu Muyat, was a prisoner in the apostles hands from Badr (Ali had captured him).  When Abu Sufyan was asked to ransom his son Amr he said, “Am I to suffer the double loss of my blood and my money? They have killed Hanzala and am I to ransom Amr?  Leave him with them.  They can keep him as long as they like!”
 
While he was thus held prisoner in Medina with the apostle Sa’d b al-Numan b Akhal, the brother of B Amr b Auf, from the subclan of B Muawwiya, went forth on pilgrimage accompanied by his young wife.  He was an old man and a Muslim who had sheep in al-Naqi (a place near Medina). 

He left that place on pilgrimage without fear of any untoward events, never thinking that he would be detained in Mecca, as he came as a pilgrim, for he knew that Quraysh did not usually interfere with pilgrim, but treat them well. But Abu Sufyan fell upon him in Mecca and imprisoned him in retaliation for his son Amr.

– Then Banu Amr b Auf went to the apostle and told him the news and asked him to give them Amr b Abu Sufyan so that they could let him go in exchange for their man and the apostle did so. So they sent him to Abu Sufyan and he released Sa’d. [6]  

বিনা মুক্তিপণেই যে বন্দিদের কে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল:

পাঁচজন বন্দীকে বিনা মুক্তিপণেই ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের বর্ণনা:

'যা আমাকে [ইবনে ইশাক] জানানো হয়েছে, বন্দীদের মধ্যে যাদেরকে বিনা মুক্তিপণে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল তারা হলেন:

১) মুহাম্মদের নিজ জামাতা আবু আল-আস ইবনে আল রাব্বি

মুহাম্মদ তাঁকে মুক্ত করেছিলেন নিজ কন্যা জয়নাবের কাছ থেকে মুক্তি পণ পাওয়ার পর। [পরবর্তীতে সেই মুক্তি পণের টাকা আবার জয়নাবের কাছে ফেরত পাঠানো হয়- বিস্তারিত পরবর্তী পর্বে।]

২) 'সেয়ফি বিন আবু রিফা বিন আবিদ বিন আবদুল্লাহ বিন উমর বিন মাখযুম

বন্দীকারীরা তাকে ধরে রাখেন। তাঁর মুক্তিপণের জন্য যখন কেউই এগিয়ে আসেন না, তখন তারা তাকে এই শর্তে মুক্তি দেন যে, তিনি ফিরে গিয়ে তাঁর মুক্তিপণের টাকা পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু তাদেরকে দেয়া সে ওয়াদা তিনি রক্ষা করেননি'।

৩) 'আবু আজযা আমর বিন আবদুল্লাহ বিন উসমান বিন উহায়েব বিন হুদাফা বিন যুমাহ

তিনি ছিলেন গরীব, কন্যাদের নিয়ে তাঁর পরিবার। তিনি আল্লাহর নবীকে বলেন, "আপনি জানেন যে, আমার কাছে কোনো টাকা-পয়সা নেই, আমাকে বিনা মুক্তিপণেই ছেড়ে দিন যাতে আমি আমার বৃহৎ পরিবারের প্রয়োজনে আসি।" আল্লাহর নবী তাঁকে বিনা মুক্তিপণেই ছেড়ে দেন এই শর্তে যে, তিনি আর কোনোদিন তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবেন না”।'  

৪) 'আল-মুত্তালিব বিন হানতাব বিন আল-হারিথ বিন ওবায়েদা বিন উমর বিন মাখযুম

তিনি বন্দী হয়েছিলেন বানু আল-হারিথ বিন আল-খাজরাযদের হাতে। তারা তাঁকে অনেকদিন ধরে রাখার পর মুক্ত করলে তিনি তাঁর পরিবারের কাছে ফিরে যান।’ [8]

৫) আমর বিন আবু সুফিয়ান

মুহাম্মদ যাকে বিনা মুক্তিপণে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

>>> বদর অভিযানে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা আবু-সুফিয়ানের বাণিজ্য-সামগ্রী লুণ্ঠনে বিফলকাম হলেও চরম নৃশংসতায় নিজেদেরই একান্ত প্রিয়জন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবদের হত্যা ও বন্দী করে তাঁদের মালামাল লুণ্ঠন ও বন্দীদের মুক্তিপণের অর্থে আরও অধিক মুনাফার অধিকারী হয়েছিলেন। মদিনায় স্বেচ্ছা নির্বাসনের (হিজরত) মাত্র সাত মাস পর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা যে-সন্ত্রাসী নবযাত্রার সূচনা (মার্চ, ৬২৩ সাল) করেছিলেন, তারই ধারাবাহিকতার প্রথম চরম নৃশংস বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল বদর নামক স্থানে। ৭০ জন ধৃত বন্দীদের মধ্যে তাঁরা দুইজন কে পথিমধ্যে খুন ও পাঁচ জনকে বিনা মুক্তিপণে মুক্তি দিয়েছিলেন।

বাকি ৬৩ জন বন্দীর প্রত্যেকের মুক্তিপণ বাবদ বন্দীর প্রিয়জনদের কাছ থেকে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা সর্ব্বোচ্চ ৪০০০ দেরহাম আদায় করেন। ৬২৩ সালে ৪,০০০ দেরহামের সমতুল্য মূল্য বর্তমানে কত তা আমার জানা নাই। তবে এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায় অল্প সময়ে বিনা পুঁজিতে এত অধিক মুনাফা অন্য কোন পেশায় উপার্জন প্রায় অসম্ভব। শুধু পার্থিব জীবিকায় নয়, সাথে আছে ধৃত নারী বন্দীদের সাথে যৌনসংগমের অপার আনন্দ-সুখ।

মুহাম্মদকে নবী হিসাবে অস্বীকারকারী, তাঁর সমালোচনাকারী ও বিরুদ্ধবাদীদের ওপর মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা বিভিন্ন অজুহাতে আগ্রাসী তৎপরতার চালান। আধিপত্য বিস্তার ও জীবিকা উপার্জনের এই পেশায় ক্রমান্বয়ে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা সন্ত্রাস ও নৃশংসতার নতুন নতুন কায়দায় অভিজ্ঞ হওয়ার পর শুধু সফলতা আর সফলতা। মদিনায় তাঁদের এই আগ্রাসী তৎপরতার সর্বপ্রথম বলি হয়েছিলেন, সেই অবিশ্বাসীরা যারা মুহাম্মদ ও তাঁর মক্কাবাসী অনুসারীদের হিজরত পরবর্তীকালে সাহায্য করেছিলেন প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে। কারা সেই হতভাগ্য তার বিস্তারিত আলোচনা পরবর্তীতে করা হবে।

(চলবে)

[কুরানের উদ্ধৃতিগুলো সৌদি আরবের বাদশাহ ফাহাদ বিন আবদুল আজিজ (হেরেম শরীফের খাদেম) কর্তৃক বিতরণকৃত বাংলা তরজমা থেকে নেয়া; অনুবাদে ত্রুটি-বিচ্যুতির দায় অনুবাদকারীর। কুরানের ছয়জন বিশিষ্ট অনুবাদকারীর পাশাপাশি অনুবাদ এখানে।  

পাদটীকা ও তথ্যসূত্র:

[1] a) “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৩০৭-৩০৮ ও ৩২১
b) “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৭, ইংরেজী অনুবাদ: W. Montogomery Watt and M.V. McDonald, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-88706-344-6 [ISBN 0-88706-345-4 (pbk)],
- পৃষ্ঠা (Leiden) ১৩৩৩-১৩৩৪

[2] Ibid ইবনে ইশাক- পৃষ্ঠা ৩১১

[3] Ibid ইবনে ইশাক- পৃষ্ঠা ৭৪০

[4][5][6] Ibid ইবনে ইশাক- পৃষ্ঠা ৩১১-৩১৩; আল তাবারী পৃষ্ঠা ১৩৪৪-১৩৪৬

[7] ইসলাম নামক ঘৃণা, হিংসা, বিভেদ ও রাজনৈতিক মতবাদ প্রচার ও প্রসারের বলী http://www.politicalislam.com/blog/tears-of-jihad/

[8] Ibid ইবনে ইশাক- পৃষ্ঠা ৩১৭-৩১৮

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন