২৫ মার্চ, ২০১৫

সহীহ মুসলিম তত্ত্বের পূর্বাপর এবং একটি কুপ্রস্তাব

লিখেছেন আশরাফুল আলম 

প্রবাসে বসবাস করেন যে সব মুসলিম, তাদের প্রায় সকলেই মডারেট মুসলিম, দুই একজন দুষ্ট লোক ছাড়া। তো সেই দুষ্ট লোকেরা উল্টাপাল্টা কিছু করলেই বাকি মডারেট মুসলিমেরা চিন্তিত হয়ে পড়েন, তাদের দিকে কেউ আঙুল তাক করল কি না, এই নিয়ে। টুইটারে-ফেসবুকে দ্রুতগতিতে হ্যাশট্যাগ মারেন 'সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই' জানিয়ে, অথবা হত্যাযজ্ঞের তীব্র নিন্দা জানান নানাভাবে। শেষে ব্যাখ্যা দেন এভাবে – এই যে সন্ত্রাসী, সে আসলে সত্যিকারের সহীহ মুসলিম না, সে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এইসব করছে। ইসলাম এসব সন্ত্রাসকে সমর্থন করে না। অতি চেনা চিত্রনাট্য, অতি ব্যবহারে জীর্ণ হওয়ার দশা, র‍্যাবের ক্রসফায়ার উপাখ্যানের মত। লন্ডন, মাদ্রিদ, টুইন টাওয়ার, সিডনী, পেশাওয়ার, কানাডা সব ঘটনার পরেই এই একই চিত্র – এইটাকে আপাতত বলা যাক ‘সহীহ মুসলিম তত্ত্ব’।

এবার আসুন, দেখে নিই, এই যুগান্তকারী তত্ত্ব কি সাম্প্রতিক মডারেট মুসলমানদের আবিষ্কার, নাকি এর সূত্র আরো কোনো গভীরে প্রোথিত?

যুক্তিশাস্ত্রে বলা হচ্ছে, ফ্যালাসি একটা এমন ধরনের যুক্তি, যা আসলে অপযুক্তি – অর্থাৎ সেটা কখনো সত্য আবার কখনো মিথ্যা। কাজেই সত্য-মিথ্যার যাচাই-বাছাইয়ের কাজে সেই অপযুক্তি বা মানদণ্ড ব্যবহার করা যাবে না, যেহেতু সে সত্য-মিথ্যা আলাদা করতে পারে না। তবে সেটা শুনতে বেশ অকাট্য যুক্তির মতই শোনায়, এবং আগে থেকে জানা না থাকলে অনেকেই এই অপযুক্তির খপ্পরে পড়ে খেই হারিয়ে ফেলতে পারেন।

যারা সামাজিক গণমাধ্যমে যুক্তি-তর্কের মাঠের খেলোয়াড়, তারা এইসব ফ্যালাসির খবর রাখেন বলেই ধারণা করি। এমন একটা ফ্যালাসিকে বলা হয় ‘নো ট্রু স্কটসম্যান’ ফ্যালাসি। এই ফ্যালাসি একটা আশ্চর্যজনক মেশিন, যার একপাশ দিয়ে আপনি যা ইচ্ছা তাই প্রবেশ করান, অন্যপাশে আপনার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বের করে আনা যাবে। ধরুন, আপনি বলতে চান যে, সকল বাংলাদেশী শিক্ষিত। কথাটা বলেই ফেললেন হয়তো কাউকে। সে আপনাকে একজন অশিক্ষিত বাংলাদেশী সামনে এনে দেখাল। আপনি বললেন, এই লোক তো আসলে সত্যিকারের বাংলাদেশী না, কাজেই তাকে গোণা হবে না। ব্যস, প্রমাণিত হয়ে গেল যে, সকল বাংলাদেশীই শিক্ষিত। 

এভাবে আপনি সকল বাংলাদেশী দেশপ্রেমিক, সকল বাংলাদেশী শান্তিপ্রিয়, সকল বাংলাদেশী মুক্তিযোদ্ধা, সকল বাংলাদেশী রাজাকার, সকল রাজাকারই মুক্তিযোদ্ধা, এগুলো অনায়াসে প্রমাণ করতে পারবেন। আবার ধরুন, এরশাদ বললেন, সব বাংলাদেশীই প্রেমিক। আপনি তখন প্রেমিক নন, এমন একজন বাংলাদেশীর উদাহরণ দিলেন। তখন এরশাদ বলবেন, হুম, তার মানে সে আসলে প্রকৃত বাংলাদেশীই না। খেয়াল করে দেখুন, “সব বাংলাদেশীই প্রেমিক” এই কথাটাই একটি অসংজ্ঞায়িত/অপ্রমাণিত কথা, এবং এই অপ্রমাণিত কথার ওপর ভিত্তি করে “প্রকৃত বাংলাদেশীই না” সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে। সেই সিদ্ধান্ত আবার প্রথমে বলা “সব বাংলাদেশীই প্রেমিক” কথাটাকে প্রমাণ করছে।

এভাবে চললে আপনি যত উদাহরণই হাজির করেন না কেন, প্রথম বাক্য “সব বাংলাদেশিই প্রেমিক”-কে ভুল প্রমাণ করতে পারবেন না। এই “নো ট্রু স্কটসম্যান” ফ্যালাসিকে বাংলায় ত্যানা-প্যাঁচানি বলা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়: উনি সহিহ মুক্তিযোদ্ধা নন, উহা আসল হিন্দুধর্ম নহে, ইনি প্রকৃত রাজাকার না, উনি খাঁটি নাস্তিক না, তিনি প্রকৃত আওয়ামী লীগার না, ইত্যাদি দাবি করা হচ্ছে। এর প্রায় সবই অপযুক্তি।

এই অপযুক্তিকে যুক্তিতে পরিণত করা যাবে, যদি স্কটসম্যানকে সংজ্ঞায়িত করে ফেলা যায়। অর্থাৎ আপনি একটা/একদল ব্যক্তি/বস্তুকে যার সাথে তুলনা করছেন, সেই জিনিসগুলোর সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা বা সীমানা-চৌহদ্দি থাকা আবশ্যক। আপনি বলতে পারেন, “সব বাংলাদেশীই প্রেমিক”, কোন সমস্যা নেই, যদি “বাংলাদেশী” এবং “প্রেমিক” ধারণাগুলোর একটা স্থির সংজ্ঞা থাকে, অন্তত আপনি যে অর্থে ‘বাংলাদেশী’ বা ‘প্রেমিক’ বলছেন, সেই প্রেক্ষিতে। সেই সংজ্ঞামতে কোনো অ-প্রেমিক বা অ-বাংলাদেশী খুঁজে পাওয়া যাবে নাকি যাবে না, সেটা পরের ব্যাপার – কিন্তু “সব বাংলাদেশিই প্রেমিক” বলতে গেলেই বাংলাদেশীর এবং প্রেমিকের সংজ্ঞা থাকতে হবে। দুটো উদাহরণ দিই, যাতে পার্থক্যটা বোঝা যায়।

দাবি: সকল এসএসসি পাশ লোকই ইংরেজি জানে। এসএসসি পাশের সংজ্ঞা: যার এসএসসি পাশের একটি মূল সনদপত্র আছে। ইংরেজি জানার সংজ্ঞা – ডেইলি স্টার পড়তে পারা। পড়তে পারার সংজ্ঞা হল পড়ে বুঝতে পারা। এখন যদি এমন একজন লোক পাওয়া যায়, যে এসএসসি পাশ, কিন্তু ইংরেজি জানে না, তাহলে ‘সে আসলে প্রকৃত এসএসসি পাশই না’ বলার সুযোগ নেই। সংজ্ঞানুযায়ী এই লোকটি এসএসসি পাশ, এবং সে ইংরেজি জানে না। কাজেই ওপরের দাবিটি ভুল, অর্থাৎ সকল এসএসসি পাশ লোক ইংরেজি জানে না।

দাবি: সকল বাংলাদেশীই মুক্তিযোদ্ধা। দাবি যিনি করছেন, তিনি বাংলাদেশীর কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা না দিয়েই এই দাবিটি করলেন। কাজেই যদি এমন একজন লোককে দেখানো যায়, যিনি মুক্তিযুদ্ধে শরীক না হয়ে বরং বিরোধিতা করেছেন, তার ব্যাপারে বলা হবে, ‘তিনি প্রকৃত বাংলাদেশী নন।’ অর্থাৎ একজন সাক্ষাৎ বাংলাদেশী অ-মুক্তিযোদ্ধা হাতে থাকা সত্ত্বেও “সকল বাংলাদেশীই মুক্তিযোদ্ধা” বাক্যটিকে ভুল প্রমাণ করা গেল না। এরকম ব্যতিক্রম একটা কেন, হাজার হাজার পাওয়া গেলেও “সকল বাংলাদেশীই মুক্তিযোদ্ধা” দাবিটি চিরদিনই সঠিক, ‘তিনি/তাঁরা প্রকৃত বাংলাদেশী নন’ ট্রাম্প-কার্ড ব্যবহার করলে। যদি বলা হত, বাংলাদেশী = বাংলাদেশের নাগরিকত্বের অধিকারী যিনি (অথবা অন্য কোনো সংজ্ঞা), তাহলে আর এই গোঁজামিল সম্ভব হতো না। তখন “সকল বাংলাদেশীই মুক্তিযোদ্ধা” কি না, তা প্রমাণ/অপ্রমাণ করার সুযোগ থাকত।

এবারে আসি সাম্প্রতিক সময়ে সহীহ মুসলিম তত্ত্বের কিছু প্রয়োগ নিয়ে। বেশ কিছু মডারেট মুসলমানকে দেখলাম কিছুদিন আগে পেশাওয়ারে হামলার ঘটনায় এই তত্ত্ব ফলাতে। বললেন, তালেবানেরা প্রকৃত মুসলিম নয়, এরা সন্ত্রাসী। এসব সন্ত্রাসীর জন্য ইসলামের নাম খারাপ হচ্ছে। ইসলাম আদতে শান্তির ধর্ম। এমনকি খোদ তালেবানেরাও এই তত্ত্ব প্রয়োগ করল পেশাওয়ারের ঘটনায়। পাকিস্তানের তালিবান, যাদের নাম তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান, তারা প্রায় দেড়শ মানুষ মারার দায় স্বীকার করল। গুলি চালানোর আগে তারা ‘আল্লাহু আকবর’ বলেই গুলি চালিয়েছিল। ওদিকে আসল যে তালেবান, মানে আফগানিস্তানের তালেবান, তারা এই ঘটনার নিন্দা জ্ঞাপন করল। তারা এটাও বলেছে, পাকিস্তানের তালেবানরা সহীহ তালিবান নয়। সহীহ তালেবান মানেই হচ্ছে শান্তির বাহক, তারা কোনোদিন নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করে না, এবং পাকিস্তানের তালেবানের এই কাজ ইসলামসম্মত নয়।

ভাবখানা এমন, যেন গুটিকয়েক উগ্র ভেজালযুক্ত তালেবানের জন্য সকল তালেবানকে দোষারোপ করা ঘোরতর অন্যায়। তাও যদি তারা ভেজালমুক্ত প্রকৃত তালেবান হত, তাহলে না হয় বলা যেত যে, অন্তত কিছু তালেবান খারাপ। কিন্তু এই তালেবানেরা সহীহ তালেবান না হওয়ায় তালেবানদের শান্তিময় ভাবমূর্তির ওপরে কোনোই আঘাত আসার উপায় নেই। যে তালেবান সন্ত্রাস করবে, সে আসলে প্রকৃত তালেবান নয়। সকল প্রকৃত তালেবান শান্তিকামী। কাজেই প্রমাণিত হলো যে, তালেবানেরা সন্ত্রাসী নয়।

‘নো ট্রু স্কটসম্যান’ ফ্যালাসির অভাবনীয় প্রয়োগ দেখলেন তো? এটার আবার নানা রকমের সংস্করণ আছে। সিডনীতে যে মুসলমান লোক একটা ক্যাফেতে জনা বিশেক লোককে জিম্মি করেছিল, সে আরবী লেখা পতাকা নিয়ে গিয়েছিল সেখানে। তার যে দাবিনামা, তার আগের যে কর্মকাণ্ড, সেই অনুযায়ী ওঝা যায়, শেখ হারোন মনিস অস্ট্রেলিয়া কর্তৃক আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোয় অতি ক্ষিপ্ত। সে ২০১৩ সালে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিল আফগানিস্তানে মারা যাওয়া অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যদের বাসায় হেইট-লেটার বা ঘৃণাভরা চিঠি লেখার জন্য। তার ভাষায়, “Shame on Team Australia and shame on those racist and terrorist Australians who support the governments of America and its allies including Australia.” তার ফেইসবুক পেইজে বলা হচ্ছে, সেটি ‘Team Islam’ against Australian oppression and terrorism. কাজেই সে যে ডাকাতি করতে ওই ক্যাফেতে যায়নি, সেটা স্পষ্ট। সে গেছে তার ধর্মের কাজে, ধর্মের নামে। কিন্তু বিধি বাম, তার নামে একাধিক মামলা হয়েছিল অতীতে, যার একটা মামলা তার আগের স্ত্রীকে খুনের চেষ্টার দায়ে। ফলে আমাদের মডারেট মুসলিমেরা বেশ আরামের সাথে সহীহ মুসলিম থিওরীর প্রয়োগ করতে পারলেন – এই লোক অ্যাটেনশান সীকার, সে ক্রিমিনাল, সে পথভ্রষ্ট, ইসলাম শান্তির ধর্ম, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ কোনো মুসলিম এই সন্ত্রাস করেনি, করেছে এক ক্রিমিনাল। আমরা মুসলমানেরা দায়মুক্ত, আমাদের দিকে কেউ আঙুল তুলবেন না।

এই শেখ হারোন মনিস যে মুসলিম নয়, তা কিন্তু তার এই ঘটনার আগে কেউই জানত না বা বলেনি। সে শেখ উপাধী নিয়ে তার নানা ধর্মীয় ও জেহাদী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। তার নামে এই যে আগের ক্রিমিনাল রেকর্ড, সে কারণে কোনো মুসলমান/অমুসলমান অথোরিটি তাকে অমুসলিম ঘোষণা করেছেন বলেও জানি না। সে নিজেকে মুসলিম দাবি করেছে, ইসলামের জন্যই সে কাজ করেছে, শেষে শহীদও হল, সমস্ত মিডিয়ায় তাকে মুসলিম বলেই চিহ্নিত করা হচ্ছে, কিন্তু আমার প্রতিবেশী মডারেট বাঙালি মুসলমান তাকে ‘সহীহ মুসলমান’ মানতে নারাজ। তার দাবি, শেখ হারোন মনিস ইসলামের নাম ব্যবহার করে অ্যাটেনশান সীক করেছে। সে সন্ত্রাসী, সহীহ মুসলিম নয়। সে ইসলাম বোঝে না, বুঝলে সন্ত্রাস করত না (আবার সেই ‘নো ট্রু স্কটসম্যান’ ফ্যালাসি)। 

সহীহ মুসলিম কাকে বলে? যারা সন্ত্রাস করে না, তারাই সহীহ মুসলিম। যেই মাত্র কেউ সন্ত্রাস করে ফেলবে, সেই মুহূর্ত থেকেই সে ভেজালযুক্ত মুসলিম, অর্থাৎ সহীহ মুসলিম নয়। ‘নো ট্রু স্কটসম্যান’ ফ্যালাসির আদর্শ প্রয়োগ। এই যুক্তির ফলে দুনিয়ার কোন সন্ত্রাসীই মুসলিম নয়। তারা শুধুই সন্ত্রাসী। তাছাড়া একজন মুসলিম কি খারাপ কাজ করতে পারে না? সবাই কি সাধু হবে?

আমি যুক্তির পথে হাঁটতে চাইলাম। বললাম, মুসলমানদের সবাইকে সাধু হতেই হবে, এমন দিব্যি কেউ দেয় নি – তারাও চোর গুণ্ডা বদমাশ মলম পার্টি রাজাকার হতে পারবে। তবে এই শেখ হারোন যদি ডাকাতি করতে গিয়ে দুইজনকে খুন করত, সেক্ষেত্রে এই কথাটা প্রাসঙ্গিক হত। একজন মুসলমানের চোর/ডাকাত হওয়া, আর একজন মুসলমানের ইসলামের স্বার্থে ইসলামের নামে সন্ত্রাস করার মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। সিডনীর মুসলিম গানম্যান হারোন আসলে ইসলাম থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছেন সশস্ত্র সংগ্রামের। 

প্রতিবেশীকে কোরান থেকে কিছু আয়াত দেখালাম ইংরেজি অনুবাদে, যেহেতু আরবি জানি না। তিনি বললেন, এই অনুবাদ সহীহ অনুবাদ নয়, আপনাকে আগে আরবি শিখতে হবে। বললাম, আরবি শিখলে কী হবে? তিনি বললেন, আরবি শিখলে দেখবেন, এইটা একটা শান্তিময় আয়াত, কেউ কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে অথবা না জেনে এখানে যুদ্ধ-টুদ্ধ খুঁজে পাচ্ছে। আমি বললাম, ইসলাম যে শান্তির ধর্ম, সেটা নিয়ে আমার আলোচনা নয়। স্বীকার করলাম যে, আপনি যেমনটা বলছেন, সেটা সম্ভব – হয়তো কোরানকে যে যার মত করে ব্যাখ্যা করে বা করছে। যেমন, কোরান বলছে, তোমরা সবাই একসাথে থাকো, একত্রে ইসলাম পালন করো – জামায়াতীরা বলছে, ইসলামে রাজনৈতিক সংগঠন করা ফরজ। কোরান বলছে, অবিশ্বাসীকে হত্যা করো (একটা নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে), কিন্তু তালেবানেরা বলছে, অবিশ্বাসীকে হত্যা করা ফরজ। অস্ট্রেলিয়া আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোয় সিডনীর গানম্যান বহুদিন থেকেই ক্ষিপ্ত, কারণ তার হিসেবে এটা অন্যায়। সে আফগানিস্তানে মারা যাওয়া অস্ট্রেলিয়ান সৈন্যদের বাসায় হেইট-লেটার লিখত। শেষে তো নিজেই মরল দুই জনকে সাথে নিয়ে। তার অনুপ্রেরণা কি নিচের এই আয়াতগুলো থেকে আসতে পারে না? 
Fight in the cause of Allah those who fight you, but do not transgress limits; for Allah loveth not transgressors. And slay them wherever ye catch them, and turn them out from where they have Turned you out; for tumult and oppression are worse than slaughter; but fight them not at the Sacred Mosque, unless they (first) fight you there; but if they fight you, slay them. Such is the reward of those who suppress faith. But if they cease, Allah is Oft-forgiving, Most Merciful. And fight them on until there is no more Tumult or oppression, and there prevail justice and faith in Allah; but if they cease, Let there be no hostility except to those who practice oppression. (2:190-193)। 
আর লড়াই কর আল্লাহর ওয়াস্তে তাদের সাথে, যারা লড়াই করে তোমাদের সাথে। অবশ্য কারো প্রতি বাড়াবাড়ি করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না। আর তাদেরকে হত্যাকর যেখানে পাও সেখানেই এবং তাদেরকে বের করে দাও সেখান থেকে যেখান থেকে তারা বের করেছে তোমাদেরকে। বস্তুতঃ ফেতনা ফ্যাসাদ বা দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করা হত্যার চেয়েও কঠিন অপরাধ। আর তাদের সাথে লড়াই করো না মসজিদুল হারামের নিকটে যতক্ষণ না তারা তোমাদের সাথে সেখানে লড়াই করে। অবশ্য যদি তারা নিজেরাই তোমাদের সাথে লড়াই করে। তাহলে তাদেরকে হত্যা কর। এই হল কাফেরদের শাস্তি। আর তারা যদি বিরত থাকে, তাহলে আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু। আর তোমরা তাদের সাথে লড়াই কর, যে পর্যন্ত না ফেতনার অবসান হয় এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর যদি তারা নিবৃত হয়ে যায় তাহলে কারো প্রতি কোন জবরদস্তি নেই, কিন্তু যারা যালেম (তাদের ব্যাপারে আলাদা)। (২:১৯০-১৯৩)
তো এই যেমন খুশি তেমন ব্যাখ্যা দাও, এইটাকে কে আটকাবে? কাজেই, আমি প্রস্তাব দিলাম, আপনারা ‘সহীহ ইসলাম-কে সংজ্ঞায়িত করে ফেলেন না কেন? কোরানের সকল আয়াতের অর্থ আপনারা সহীহ মতে লিপিবদ্ধ করেন, যাতে দুষ্ট লোকেরা তাদের মনগড়া/ভ্রান্ত ব্যাখ্যা অনুযায়ী সন্ত্রাস করলেও সেইটা আপনাদের গায়ে না আসে আর কি! আপনারা এই কোরান ইংরেজিতে লিখবেন, যাতে ‘কোরান বোঝার আগে যান আরবী শিখে আসেন’ এই ধাপ্পা দিয়ে দুষ্ট লোকেরা কোরানের ঠিকাদারি নিজেদের হাতে না রেখে দিতে পারে অনির্দিষ্টকালের জন্য। আপনারা সহীহ মডারেট মুসলিমেরা একটা লেস-টক্সিক, নির্দোষ সুগার-কোটেড অর্থ নিয়ে সুখে শান্তিতে থাকবেন, ওদিকে কিছু বদমায়েশ লোক ভুলভাল একটা ব্যাখ্যা নিয়ে গানম্যান হবে, তালেবান হবে, আল-কায়েদা হবে, শেখ হারোন হবে। তো হোক না, তাতে আপনাদের কি! আপনারা শুধু ‪#‎iCondemnAllTerror‬ হ্যাশট্যাগ মারতে থাকবেন। আপনাদের কোরানের ভার্শন হবে ‘সহীহ মডারেট কোরান’।

এই এই কুপ্রস্তাব শুনেও প্রতিবেশী আমার মাথার দাম নির্ধারণ করেননি, কারণ আমরা অস্ট্রেলিয়ায় থাকি। বাংলাদেশে হলে আমার এই প্রস্তাবের জন্য কী যে ঘটত, বলতে পারি না। তবে আমার প্রস্তাবটা কিন্তু মন্দ না। বিশ্বব্যাপী একটা ডিরেক্টরি থাকবে সহীহ মুসলমানদের। তারা চলবে সহীহ মডারেট কোরান দ্বারা। আর কারা কারা দুষ্ট লোক, সহীহ মুসলমান নয়, তাদেরও তালিকা থাকবে। ফলে কেউ সন্ত্রাস করলে আমরা নিজেরা দেখতেই পারব, সে সহীহ মুসলমান ছিল, নাকি সহীহ মুসলমান ছিল না। সারা দুনিয়ায় সহীহ মুসলমানদের দিকে কেউ আর আঙ্গুল তাক করবে না সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য। যত দোষ ওই আন-সহীহ না-বুঝদার আনপড়াহ সন্ত্রাসীদের।

মোদ্দাকথা হলো, সকল মুসলিম সন্ত্রাসী ইসলাম ভুল বুঝেছে – অথবা তারা সহীহ বিশুদ্ধ মুসলিম নয়, এইটা স্রেফ একটা ডিনায়্যাল, এবং ‘সহীহ মুসলিম’ ও ‘ইসলাম-কে সংজ্ঞায়িত করার আগ পর্যন্ত এইটা একটা লজিক্যাল ফ্যালাসি। অপযুক্তি। এই যে মডারেট মুসলমানদের ডিনায়্যাল মুড, এইটার কারণ সম্ভবত তাদের অপরাধবোধ বা ক্রাইসিস – তারা জানে যে, তারাও সেই একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী, অথবা তাদের বিশ্বাস খুবই কাছাকাছি, তারা শুধু পালন করে না, এই যা। পার্থক্য শুধু কমিটমেন্টের। তারা ইহুদি-নাসারাদেরকে ঘৃণা করে, তালেবানরাও করে। তারা জানে যে, তাদের ধর্মই একমাত্র সেরা ধর্ম, তালেবানরাও জানে। তারা জানে যে, অস্ট্রেলিয়ান সরকার আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠিয়ে মুসলিমদেরকে মেরে ভুল করেছে (এইখানে তারা মানে মডারেট সহীহ মুসলিমেরা। আপাতত ধরা যাক, অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশী মুসলিমেরা।), অথচ তারা তাদের পয়েন্ট প্রমাণ করার জন্য কাউকে গানপয়েন্টে জিম্মি করেনি। সিডনীর ওই লোকটা করেছে, কারণ তার বিশ্বাস বেশ শক্ত, এবং সে সুবিধাবাদী নয়। মডারেট সহীহ মুসলিমেরা সাহসের অভাবে, সুযোগের অভাবে, নাকি বিশ্বাসের গাছতলায় মাটির অভাবে বন্দুক হাতে নেয়নি, সেটা বলা শক্ত। এই একটা ডিলেমা তাদের – তারা এই মৌলবাদীদের থেকে বিশ্বাসের জায়গায় খুব একটা দুরে না, সেটা তারা ভাল করেই জানে, আর তাই ওপরিতলে এসে অস্বীকারের প্রাণান্তকর চেষ্টা। প্রি-এম্পটিভ ডিনায়্যাল। যখন একজন মৌলবাদী খ্রিষ্টান কোনো সন্ত্রাস করে, তখন অন্য কোনো খ্রিষ্টানকে কিন্তু ডিনায়্যাল মুডে যেতে হয় না, আগ বাড়িয়ে হ্যাশট্যাগ মেরে ‘আমি তো কলা খাই নি’ বলতে হয় না, কারণ তারা বিশ্বাসের জায়গাতে মৌলবাদীদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে কয়েক প্রজন্ম আগে।

সিডনীর এই লোকটা সন্ত্রাসী, এবং সে মুসলিম। তালেবানেরা সন্ত্রাসী এবং তারাও মুসলিম। সম্ভবত তারা একটু বেশিই মুসলিম। যাই হোক, আমার আশেপাশে যারা মডারেট ওরফে সহীহ মুসলিম আছেন, তারা প্লিজ শর্মিন্দা হবেন না। মডারেট মুসলিম কিম্বা সহীহ মুসলিম হওয়াতে দোষের কিছুই নেই, বরং আপনার নিজের পরিচয়ে গর্বিত হোন। তবে দিনকাল যা পড়েছে, আপনারা তাড়াতাড়ি ‘সহীহ মুসলিম’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে সহীহ মডারেট কোরান মোতাবেক সহীহ মুসলমানের তালিকা না বানালে ভবিষ্যতেও কিছু খারাপ মানুষ ইসলামের নাম নিয়ে সন্ত্রাস করবে। সে পর্যন্ত আপনারা এসব ক্ষেত্রে প্লিজ একটা করে ‪#সন্ত্রাসীর_কোনো_ধর্ম_নেই‬ হ্যাশট্যাগ মেরে দিতে ভুলবেন না। আশা করি, কেউ আপনাদেরকে সন্দেহ করবে না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন