৫ জুলাই, ২০১৫

জগন্নাথের অপমান: ওড়িশা বন্ধ

লিখেছেন সফি

ঈশ্বরবিশ্বাসীরা বিভিন্ন দিক থেকে ঈশ্বর-সাগরে মিলিত হন। ঈশ্বরবিশ্বাসের যুক্তিগুলো সাজালে রাশিচক্র-"বিজ্ঞানীরা" হয়তো নানা রকম ডিস্ট্রিবিউশন প্লট দেখিয়ে আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা দিতে পারবেন। তবে আমার বেশ কিছু বন্ধু আছে, যাদের অনেকেই বেশ বুদ্ধিমান। তাদের মধ্যে যে-ধারণা সব থেকে সুস্পষ্টভাবে আসে, সেটা কিছুটা এরকম:

বাড়ির ঝাঁটাটা খগেনের মা তৈরি করেছে, কাঠের টেবিলটা ঐ পাড়ার রতন মিস্ত্রি, বাড়িটা লিয়াকত মিস্ত্রির, ফ্যানটা কোনও অজানা মিস্ত্রি, কম্পিউটারটার নানা অংশ অনেক অজানা মানুষ, রাস্তার ধারের ব্যাঙের ছাতাটা আশেপাশে থাকা কোনও ব্যাঙ। উই-ঢিবিটা উই পোকাগুলো, মৌচাকটা ঐ ভনভন করতে থাকা মৌমাছিগুলো। অর্থাৎ কোনওকিছু দেখলে তার একজন স্রষ্টার কথা মাথায় আনতেই হবে। 

তাই গ্রহ-নক্ষত্র দেখলেই সেসবের স্রষ্টার কথা স্মরণ করে ঈশ্বর-আল্লা-ভগবানের অসীম কুদরতের জন্য নানা ভাষায় নানা মন্ত্র যপা উচিত। সুতরাং আর কোথায় মুক্তি? সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের তত্ত্বাবধানে একাধিক ছোট-বড় ঈশ্বর অথবা একমেবদ্বিতীয়ম ঈশ্বর ব্রহ্মাণ্ডে আছেনই আছেন। "কোনও বুদ্ধিমান মানুষ ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করবেন না।” 

কিন্তু আমরা যারা বুদ্ধিমান না হয়ে একটু মূর্খের মত একটু আগে শেখানো তত্ত্ব ধরে আর একটু এগিয়ে এই সৃষ্টিতত্ত্বের অস্তিত্ব স্বীকার করে জিজ্ঞেস করি, ঈশ্বরের স্রষ্টা কে? তাঁর প্রাণ কে করেছে দান? কী ধাতুতে তিনি তৈরি হয়েছেন? তিনি বস্তু না চৈতন্য? বস্তু ও চৈতন্যের সঙ্গে তাঁর কীরকম সম্পর্ক? তখন বুদ্ধিমান বন্ধুদের উত্তরটা একটু গোলমেলে হয়ে যায়। "সর্বশক্তিমানের আবার স্রষ্টা হয় নাকি!”

হয়, শক্তিমান জগন্নাথের হয়। জগন্নাথ নিজের প্রাণটা পুরাতন বিগ্রহ থেকে নতুন বিগ্রহে সরাতে পারেন না। এক বা দুই মহাশক্তিধর সেই কাজটা যদি করেন, তাহলে তাঁকে শক্তিমান জগন্নাথের থেকেও শক্তিমান ধরতে হবে। ঘটনাগুলো আমার বন্ধু সার্কেলে অনেকেই হয়তো জানেন, আমার কাছে শুধু প্রাণ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটা একটু আধটু জানা থাকলেও, বিক্ষিপ্তভাবে কিছুটা জ্ঞান অর্জন সম্প্রতি হয়েছে। সেই নিয়ে গত ২৬ শে জুন সারা ওড়িশা রাজ্যের বন্ধের একটু ব্যাখ্যা করবো। 

সকালে এক অধ্যাপকের গাড়িতে চেপে ভুবনেশ্বর শহরে আচার্য বিহার থেকে সৈনিক স্কুলের দিকে সচিবালয় মার্গের যে-রাস্তা গেছে, সেই রাস্তা ধরে নালকো মোড়ের দিকে ২ কিমি রাস্তায় বেরিয়েছিলাম। জানতাম না, সেদিন বন্ধ ছিল। অধ্যাপক এবং সঙ্গে থাকা একজন ফেলো জানত। আমি রাস্তায় বেরিয়ে রাস্তাঘাট ফাঁকা দেখে একটু অবাক হয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই বন্ধের টের পেয়েছিলাম। একটু যেতেই কয়েকজন জাতীয় পতাকা হাতে বাইক নিয়ে আসছে, একজন রাস্তার ট্র্যাক পরিবর্তন করে সোজা আমাদের গাড়ির দিকে আসছে, উল্টোদিক দিয়ে আসছে কেন, বুঝতে পারিনি। প্রাথমিকভাবে রাস্তার ধারের মস্তান বাহিনী মদ খেয়ে নিয়ম ভেঙে উল্টোদিকে আসছে ভেবেছিলাম। দু'-চারজন সোজা আমাদের গাড়ির দিকে তেড়ে আসতে বুঝেছিলাম, বাইক আরোহী আমাদের জন্যই উল্টো ট্রাকে আসছে। বাইক আরোহী সোজা এসে গাড়িতে এক লাথি মারে। হঠাৎ কী হচ্ছে, বুঝতে পারিনি। পরে বুঝতে পারলাম, বন্ধের দিনে গাড়ি চালানোর জন্য এই ব্যবহার। আমি তখনও বন্ধের ব্যাপারে কিছু না জানার জন্য ভ্যাবাচ্যাকা। তাদের মধ্যে একজন হাতে লাঠি নিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসা অধ্যাপকের কাছে আস্তেই তিনি কাচ খুলে বললেন, ছোট বাচ্চাকে আনতে যাচ্ছেন। ভদ্রলোকের কোথায় লাঠি হাতে বাইকের তরুণ আমাদের ছেড়ে দিলো। আমার সঙ্গের ওপরতলার মানুষ দু'জন স্বাভাবিকভাবেই সর্বনাশা বন্ধের জন্য দেশের অন্ধকার ভবিষ্যৎ স্মরণ করলেন। আমি চিন্তা করছিলাম, রাজ্যে কিছু গুরুতর ব্যাপার হয়ত ঘটেছে, কিন্তু আমি জানি না। ঘরে ফিরেই জানতে হবে। গুগুলে ওড়িশার সাম্প্রতিক খবরের খোঁজ করতেই বন্ধের কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে জানতে পারলাম। জানার পর সারাদিন হেসেছি।


জগন্নাথের মূর্তি ১২ বছর (সংখ্যাটা একটু অন্যরকম হতেও পারে) অন্তর নতুন করে তৈরি করে, পাল্টানো হয়। তার জন্য প্রাচীন কোনও নিমগাছ কেটে মূর্তি বানানো হয়। সেই মূর্তি নির্দিষ্ট একটা দিনে গভীর রাতের নির্দিষ্ট একটা সময়ে অতীব গোপনে একটি নির্দিষ্ট কক্ষে পুরাতন মূর্তি ও নতুন মূর্তি পাশাপাশি রাখা হয়। এই প্রাণ প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক গল্প তারপরে শুনতে পেয়েছি। যাঁরা প্রাণ পরিবর্তন করবেন, কখনও তাঁরা নানা স্বপ্ন পেয়ে থাকেন। কেউ বলেন, যাঁরা প্রাণ সঞ্চার করেন, তারপরে তাঁরা আর বেশিদিন বাঁচেন না। নিন্দুকেরা আবার না বাঁচার কাহিনীটি সজীব রাখার জন্য আরও অন্ধকারময় কিছু কার্যকলাপের অভিযোগ আনেন। সেই সব নিয়ে আলোচনায় আমার উৎসাহ নেই।

এই বছর সেরকম একটি বছর, গত ১৫ জুন সেরকম মূর্তি পরিবর্তনের দিন ছিল, নতুন মূর্তি আগেই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। শুধু মূর্তি রাখলেই তো হবে না। পুরানো মূর্তি থেকে প্রাণটা নিয়ে নতুন মূর্তিতে প্রতিষ্ঠা করতে হয় নিয়ম-রীতি মেনে। ভগবান নিজের নতুন শরীরে প্রাণ প্রতিষ্ঠা না করতে পারলে তার থেকে বড় কোনও ভগবানের নিশ্চিতভাবে দরকার। জগন্নাথের মন্দিরে এরকম ছোট থেকে বড় নানা ভগবান পুরোহিত আছেন। তাঁদের মধ্য থেকে কোনও দুই পুরোহিতের ওপরে প্রাণ সঞ্চারনের দায়িত্ব পড়ে। এই সিদ্ধান্ত নিরঙ্কুশভাবে হয়নি। যথারীতি তাই নিয়ে দলাদলি হতে থাকে পুরোহিতদের মধ্যে। দাবিদার অনেক থাকলেও প্রাণ প্রতিষ্ঠার এই মহান ক্ষমতা যে-দু'জনকে দেওয়া হয়, তাদের বিরুদ্ধে এক বাপ-বেটা পুরোহিত ক্ষুব্ধ হয়। নির্দিষ্ট দিনে এক ছোট পুরোহিত মনে করে, ওদের দুইজনের সঙ্গে তার বাবা (বয়স্ক পাণ্ডা) যেন গুপ্ত কক্ষে যেতে পারে। সেটা কিছু পুরোহিতদের সমর্থনে দুটি গোষ্ঠীর সৃষ্টি হয় নির্দিষ্ট সময়ে। এই দুই গোষ্ঠীর বচসার জেরে নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যায় ও প্রাণ প্রতিষ্ঠা একদিন পিছিয়ে যায়। এই ভয়ঙ্কর ঘটনায় হাহাকার পরে যায়। লক্ষ-কোটি ভগবানের ভক্তের অনুভূতিতে ভয়ঙ্কর সব আঘাত পড়ে। পরেরদিন পুরীতে বন্ধ পালিত হয়। তার পরে পুরীর মন্দিরের আধিকারিকরা ওপরোক্ত দুই ভগবান পাণ্ডাকে সাসপেন্ড করে। বেশ কয়েকদিন কাটার পরেও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বিষয়টা নিয়ে কিছু বলছেন না। তাহলে নিশ্চয়ই মুখ্যমন্ত্রী দায়ী। নবিন পট্টানায়েকের পদত্যাগের দাবীতে ৩০ জুন থেকে বিজেপি সারা রাজ্য জুড়ে ৫ দিন প্রচার, বিক্ষোভের কর্মসূচী নিলে কংগ্রেসের পক্ষে চুপ থাকা কি সম্ভব? তাঁরা গত ২৪ তারিখে ঘোষণা করে ২৬ জুন সারা রাজ্যে বন্ধ। 

ঈশ্বর, ভগবান বা আল্লার নাম নিয়ে লেখাটা শুরু হলেও সেই অজানা ব্যক্তি নিয়ে কিছু বলা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমার উদ্দেশ্য মানুষের ভালোর জন্য কাজ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ রাজনৈতিক দলের কার্যকলাপ নিয়ে। ওড়িশাতে অনাহারে মৃত্যু থেকে অগণিত মানুষের অপুষ্টির ছবি যে ভগবান দেখতে পান না, বা দেখলেও তার জন্য কিছু কর্মসূচী ভগবানের নেই, সেটা বুঝে গেছি। রাজনৈতিক দলগুলি যেখানে এসবের ঠিকা নিয়ে থাকে, তারা কি জনশিক্ষা ও স্বাস্থ্যের করুণ অবস্থা নিয়ে রাজ্য বা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে এভাবে ঐক্যের সঙ্গে কি বন্ধ ডাকে? তার থেকেও বড় প্রশ্ন: সাধারণ মানুষ কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সেই বন্ধের পক্ষে দাঁড়াবে?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন