৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

বনি কুরাইজা গণহত্যা - ৫: "দলে দলে ধরে এনে গর্ত পাশে এক এক করে জবাই!" কুরানে বিগ্যান (পর্ব- ৯১) ত্রাস, হত্যা ও হামলার আদেশ – পঁয়ষট্টি

লিখেছেন গোলাপ

পর্ব ১ > পর্ব ২ > পর্ব ৩ > পর্ব ৪ > পর্ব ৫ > পর্ব ৬ > পর্ব ৭ > পর্ব ৮ > পর্ব ৯ > পর্ব ১০ > পর্ব ১১ > পর্ব ১২ > পর্ব ১৩ > পর্ব ১৪ > পর্ব ১৫ > পর্ব ১৬ > পর্ব ১৭ > পর্ব ১৮ > পর্ব ১৯ > পর্ব ২০ > পর্ব ২১ > পর্ব ২২ > পর্ব ২৩ > পর্ব ২৪ > পর্ব ২৫ > পর্ব ২৬ > পর্ব ২৭ > পর্ব ২৮ > পর্ব ২৯ > পর্ব ৩০ > পর্ব ৩১ > পর্ব ৩২ > পর্ব ৩৩ > পর্ব ৩৪ > পর্ব ৩৫ > পর্ব ৩৬ > পর্ব ৩৭ > পর্ব ৩৮ > পর্ব ৩৯ পর্ব ৪০ > পর্ব ৪১ > পর্ব ৪২ > পর্ব ৪৩ > পর্ব ৪৪ > পর্ব ৪৫ > পর্ব ৪৬ > পর্ব ৪৭ > পর্ব ৪৮ > পর্ব ৪৯ > পর্ব ৫০ > পর্ব ৫১ > পর্ব ৫২ > পর্ব ৫৩ > পর্ব ৫৪ > পর্ব ৫৫ > পর্ব ৫৬ > পর্ব ৫৭ > পর্ব ৫৮ > পর্ব ৫৯ > পর্ব ৬০ > পর্ব ৬১ > পর্ব ৬২ > পর্ব ৬৩ > পর্ব ৬৪ > পর্ব ৬৫ > পর্ব ৬৬ > পর্ব ৬৭ > পর্ব ৬৮ > পর্ব ৬৯পর্ব ৭০ > পর্ব ৭১ > পর্ব ৭২ > পর্ব ৭৩ > পর্ব ৭৪ > পর্ব ৭৫ > পর্ব ৭৬ > পর্ব ৭৭ > পর্ব ৭৮ > পর্ব ৭৯ > পর্ব ৮০ > পর্ব ৮১ > পর্ব ৮২ > পর্ব ৮৩ > পর্ব ৮৪ > পর্ব ৮৫ > পর্ব ৮৬ > পর্ব ৮৭ > পর্ব ৮৮ > পর্ব ৮৯ > পর্ব ৯০

বনি কুরাইজার লোকেরা অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত ও দুঃসহ অবস্থায় বিনা শর্তে স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কাছে আত্মসমর্পণের পর তাঁদের মিত্র আল-আউস গোত্রের লোকেরা মুহাম্মদের নিকট বনি কুরাইজার লোকদের প্রাণভিক্ষার যে-আবেদন করেছিলেন, তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে মুহাম্মদ চতুরতার আশ্রয়ে সা"দ বিন মুয়াদ নামের তাঁরই এক একান্ত বিশ্বস্ত সহচরকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের মাধ্যমে কী কৌশলে "তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার ব্যবস্থা করেছিলেন”, তাঁর এই প্রিয় অনুসারীর অমানুষিক নৃশংস রায় ঘোষণার পর উৎফুল্ল মুহাম্মদ এই রায়ের সাথে কীভাবে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলেন, মুহাম্মদের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে সংঘটিত মানব ইতিহাসের এই জঘন্য মানবতাবিরোধী অপরাধের বৈধতা প্রদানের অপচেষ্টায় মুহাম্মদ অনুসারী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা সচরাচর কী ধরনের মিথ্যাচার, তথ্যবিকৃতি ও চতুরতার আশ্রয় অবলম্বন করেন, 'সিরাত' রচনার এক শতাব্দীরও অধিক পরে ইমাম বুখারী রচিত হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত "বনি কুরাইজা গোত্রের লোকেরা সা'দের রায় মেনে নিতে রাজি হয়েছিলেন" দাবিটি কী কারণে মিথ্যাচার - ইত্যাদি বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা আগের পর্বে করা হয়েছে।

আদি উৎসের বর্ণনায় যে-বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো বনি কুরাইজা গোত্রের লোকদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর তাঁদের বিরুদ্ধে রায় প্রদানের পূর্ব পর্যন্ত যে স ঘটনাপ্রবাহ সংঘটিত হয়েছিল, তা ছিল মুহাম্মদ ও আল-আউস গোত্রের লোকদের মধ্যে, বনি কুরাইজার কোনো লোক এ স ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিলেন না। বনি কুরাইজা উপাখ্যানের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের বর্ণনায় এর প্রমাণ আবারও সুস্পষ্ট।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের (৭০৪-৭৬৮ সাল) বর্ণনার পুনরারম্ভ: [1] [2]

পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ৯০) পর:

'তারপর তারা আত্মসমর্পণ করে ও আল্লাহর নবী তাদেরকে মদিনার বনি আল-নাজজার গোত্রের আল-হারিথের কন্যার এলাকায় আটক করে রাখেন।

তারপর আল্লাহর নবী মদিনার বাজারটিতে গমন করেন (যেটি আজও মদিনার বাজার হিসাবেই আছে) এবং সেখানে গর্ত খনন করেন। অতঃপর তিনি তাদেরকে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন এবং তাদের কল্লা কেটে ঐ গর্তগুলোর মধ্যে নিক্ষেপ করেন, তাদেরকে দলে দলে তাঁর কাছে আনা হয়েছিল।

তাদের মধ্যে ছিল আল্লাহর শত্রু হুয়েই বিন আখতাব ও তাদের নেতা কাব বিন আসাদ। [পর্ব: ৮০]। তাদের মোট সংখ্যা ছিল ৬০০ অথবা ৭০০জন, যদিও কিছু লোক তাদের এই সংখ্যা সর্বোচ্চ ৮০০ অথবা ৯০০ বলে ন্যস্ত করেন।

যেহেতু তাদেরকে দলে দলে আল্লাহর নবীর কাছে আনা হয়, তারা কাব-কে জিজ্ঞাসা করে জানতে চায় যে, তাদেরকে কী করা হবে বলে তার মনে হয়

সে জবাবে বলে, "তোমাদের বোধশক্তি কি কখনো হবে না? তোমরা কি দেখছো না যে, তলবকারীরা কখনো তলব থামাচ্ছে না ও যাদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তারা আর ফিরে আসছে না? আল্লাহর কসম এটি হলো মরণ!"

আল্লাহর নবী তাদেরকে শেষ করার আগে পর্যন্ত এমনটি চলতে থাকে। 

দড়ি দিয়ে দুই হাত ঘাড়ের সাথে বাঁধা অবস্থায় হুয়েই-কে এক ফুল-অঙ্কিত ঢিলা পোশাক (তাবারী: 'গোলাপি রংয়ের কাপড়ের স্যুট') পরিহিত অবস্থায় ধরে আনা হয়, যে-পোশাকটির সবখানে সে আঙুলের মাথা সাইজের বহু ছিদ্র করে রেখেছিল, যাতে এটা লুটের মাল হিসেবে কেউ ব্যবহার করতে না পরে। যখন সে আল্লাহর নবীকে দেখে, সে বলে, "ঈশ্বরের কসম, তোমার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্য আমি নিজেকে দোষারোপ করি না, কিন্তু যে ঈশ্বরকে পরিত্যাগ করে, সেইই হয় পরিত্যক্ত।"

তারপর সে লোকজনদের কাছে যায় ও বলে, "ঈশ্বরের আদেশ সত্য। একটি গ্রন্থ ও একটি ফরমান, ইসরাইলের সন্তানদের বিরুদ্ধে গণহত্যার উপাখ্যান লিপিবদ্ধ আছে।" অতঃপর সে বসে যায় ও তার কল্লা কেটে ফেলা হয়। --

উরওয়া বিন আল-যুবাইয়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মুহাম্মদ বিন জাফর বিন আল-যুবায়ের [3] আমাকে জানিয়েছেন যে, আয়েশা বলেছেন:

'তাদের মাত্র একজন মহিলাকে খুন করা হয়। সে তখন প্রকৃতপক্ষে আমার [আয়েশার] সাথেই ছিল ও কথা বলছিল। যখন আল্লাহর নবী বাজারের মধ্যে তার লোকদের হত্যা করছিল, তখন সে সীমাতিরিক্ত হাসাহাসি করছিল। সেই মুহূর্তে হঠাৎ এক অপরিচিত কণ্ঠস্বর তার নাম ধরে ডাকে।

আমি চিৎকার করে বলি, "হে আল্লাহ, ব্যাপার কী?"
সে জবাবে বলে, "আমাকে খুন করা হবে।"
আমি বলি, "কী কারণে?"
সে বলে, "আমি কিছু একটা করেছি।"
তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ও তার কল্লা কেটে ফেলা হয়।'

আয়েশা বলতেন, "তাকে যে খুন করা হবে, তা সর্বক্ষণ যাব জানা সত্ত্বেও তার সেই আশ্চর্য খোশমেজাজ ও অট্টহাসির ঘটনা আমি কখনো ভুলব না।[4] [5]

আল-তাবারীর (৮৩৯-৯২৩ সাল) অতিরিক্ত বর্ণনা:

'ইবনে ইশাকের মতে বনি কুরাইজা বিজয় সংঘটিত হয়েছিল জিলকদ মাসে [5] অথবা জিলহজ মাসের শুরুতে। যদিও আল-ওয়াকিদি [৭৪৮-৮২২ সাল] বলেছেন যে, আল্লাহর নবী তাদেরকে আক্রমণ করেছিলেন জিলকদ মাস শুরু হওয়ার অল্প কিছুদিন আগে। তিনি বর্ণনা করেছেন (asserted), আল্লাহর নবী এই হুকুম জারি করেন যে, বনি কুরাইজার জমিতে যেন অবশ্যই খাত খনন করা হয়।

তারপর তিনি বসে পড়েন ও তাঁর উপস্থিতিতে আলী ও আল-যুবায়ের তাদের কল্লা কেটে ফেলা শুরু করেন। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, ঐ দিন আল্লাহর নবী যে মহিলাটিকে হত্যা করেন, তার নাম ছিল বুনানা, সে ছিল আল-হাকাম আল-কুরাজির স্ত্রী।

এই সেই মহিলা, যে জাঁতা নিক্ষেপ করে খাললাদ বিন সুয়ায়েদ-কে হত্যা করে। আল্লাহর নবী তাকে ডেকে আনার জন্য বলেন ও খাললাদ বিন সুয়ায়েদের হত্যার প্রতিশোধে তার কল্লা কেটে ফেলেন।’ [6] [7]

সুন্নাহ আবু দাউদ, হাদিস নং ২৬৬৫ 

উম্মে মুমেনিন আয়েশা হইতে বর্ণিত: ‘মাত্র একটি ছাড়া বনি কুরাইজার আর কোনো মহিলাকে হত্যা করা হত্যা করা হয়নি। সে আমার সঙ্গেই ছিল, কথা বলছিল এবং পিঠ ও পেটের জোরে হাসছিল (অতিমাত্রায়) যখন আল্লাহর নবী (তাঁর উপর শান্তি বর্ষিত হউক) তরবারির মারফত তার লোকজনদের হত্যা করছিলেন।

হঠাৎ এক লোক মহিলাটির নাম ধরে ডাকে, "অমুক কোথায়?"
মহিলাটি বলে, "আমি।"। আমি জিজ্ঞাসা করি, "তোমার সাথে কী ব্যাপার?"
সে বলে, "আমি একটা নতুন কাজ করেছি।"

তিনি বলেন, লোকটি তাকে ধরে নিয়ে যায় ও তার কল্লা কেটে ফেলে।

তিনি বলেন, যদিও সে জানতো যে, তাকে হত্যা করা হবে তথাপি তার সেই অতিমাত্রায় হাসির কথা আমি কখনোই ভুলবো না।’ [8]

(অনুবাদ, টাইটেল ও [**] যোগ - লেখক।)

>>> মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী, আল-ওয়াকিদি, আবু দাউদ (৮১৭-৮৮৯ সাল) প্রমুখ আদি ও বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যে-বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো - "বনি কুরাইজা গণহত্যা" দিনটিতে মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা মানব ইতিহাসের মানবতাবিরোধী অপরাধের সবচেয়ে জঘন্য হৃদয়বিদারক অমানুষিক ও নৃশংস ইতিহাসের একটি উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন!  

তাঁদের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, ঐদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা ৬০০-৯০০ জন বনি কুরাইজা গোত্রের লোককে, তাঁদের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পরে নিরস্ত্র ও বন্দী অবস্থায় সদ্য খোঁড়া গর্ত পাশে দলবদ্ধভাবে ধরে নিয়ে এসে এক এক করে গলা কেটে খুন করে তাঁদের কাটা মুণ্ডু ও লাশগুলো গর্তে নিক্ষেপ করে।

৬২৭ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল মাসের সেই দিনটি কেমন হৃদয়বিদারক, ভয়ংকর ও বিভীষিকাময় ছিল, তা আজকের একবিংশ শতাব্দীর মানুষের পক্ষে কল্পনাও করা সম্ভব নয়। কারণ, আজকের এই আধুনিক যুগের মত সেই আমলে একের অধিক লোককে নিমেষে হত্যা করার মত কোনো হাতিয়ার ছিল না। সেকালে না ছিল কোনো কামান-বন্দুক-রাইফেল বা মেশিনগান, না ছিল কোন বোমা বা রাসায়নিক অস্ত্র - যার সাহায্যে অল্প বা অধিক দূরত্বে অবস্থান করে মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের আর্তনাদ ও ভয়ানক মরণযন্ত্রণা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ না করে একই সাথে নিমেষেই বহু লোককে হত্যা করা সম্ভব ছিল। সেকালে প্রত্যেকটি মানুষকে অতি নিকট থেকে এক এক করে খুন করতে হতো। মৃত্যু পথযাত্রী সেই মানুষটির আর্তনাদ ও মরণযন্ত্রণা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ না করার কোনো উপায় ছিল না।  

এমনই এক সময়ে, "এক দিনে ৬০০-৯০০ জন নিরস্ত্র লোককে এক এক করে গলা কেটে খুন করার নৃশংসতার দৃশ্য কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে” তার কিছুটা উপলব্ধি একটি সরল অংকের মাধ্যমে প্রকাশ করার চেষ্টা করছি:

“ধরে নেয়া যাক, মুহাম্মদ ও তাঁর অনুসারীরা এই অমানুষিক নৃশংসতা শুরু করেছিলেন অতি প্রত্যুষের নামাজ (ফজর) শেষ করার পরে পরেই, আনুমানিক সকাল ৪টা ৩০ মিনিটে; এবং তা সমাপ্ত করেছিলেন মাগরিবের (সন্ধ্যার) নামাজের পর, আনুমানিক সন্ধ্যা ৮টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত! দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টার বিরতিহীন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যার অভিযান!


৬০০ -৯০০ জন লোককে ১৬ ঘণ্টায় এক এক করে 'গলা কেটে খুন' অর্থাৎ ঘণ্টায় ৩৮-৫৬ জন লোকের শিরশ্ছেদ! অর্থাৎ, সুদীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা যাবত বিরতিহীন প্রতি ১-২ মিনিটে একজন লোকের 'কল্লা কেটে' তাঁর মস্তক ও লাশ গর্তে নিক্ষেপ! যদি এই কর্মটি তাঁরা ৮ ঘণ্টায় সমাপ্ত করেন, তবে তা হবে প্রতি মিনিটে ১-২জন লোককে গলা কেটে খুন! বিরতিহীন ৮ ঘণ্টা যাব

'শুধু কি হত্যা!

আরও আছে, সদ্য খুন করা ঐ মানুষগুলোর স্ত্রী, মাতা, কন্যা, ভগ্নী ও ছোট সন্তানদের নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়ার জন্য বিলি-বণ্টনের ব্যাপার! তার ওপর আছে নিজ নিজ ভাগে পাওয়া বনি কুরাইজা মহিলাদের (যৌনদাসী) ধর্ষণের ব্যবস্থা! সেই দিনটি ছিল মানব ইতিহাসের এমনই এক ভয়াবহ দিন!

আদি উৎসের বনি কুরাইজা উপাখ্যানের বর্ণনায় আমরা জানতে পারি যে, যেদিন এই অমানুষিক নৃশংসতা সংঘটিত হয়েছিল, সেদিন ঘটনাস্থলে নবী পত্নী আয়েশা (৬১৩/৬১৪-৬৭৮ সাল) উপস্থিত ছিলেন ও তিনি এই ভয়াবহ নৃশংসতা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৩-১৪ বছর। ১৩-১৪ বছরের কোনো শিশুর চোখের সামনে যখন এমনই এক বিভীষিকাময় দৃশ্য সংঘটিত করা হয়, তখন সেই শিশুটির মনে এই ঘটনার বিরূপ প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী, আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে এটি আজ প্রমাণিত সত্য।

ইসলাম-বিশ্বাসী পণ্ডিত ও অপণ্ডিতরা যে দাবিটি সচরাচর করে থাকেন, তা হলো:

"হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) নিজ হাতে কখনোই কাউকে যে হত্যা করেননি, শুধু তাইই নয়, তিনি কাউকে কখনো কোনো শারীরিক আঘাত পর্যন্ত করেননি। কোনো মহিলাকে হত্যা করার তো কোনো প্রশ্নই আসে না!"

কিন্তু আদি উৎসের ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় তাঁদের এই দাবির বিপরীত চিত্র বিদ্যমান। মুহাম্মদ ইবনে ইশাক, আল-তাবারী ও আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, মুহাম্মদ নিজে মদিনার বাজারে গিয়ে গর্ত খনন করেছিলেন ও এই হত্যাকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। আল-ওয়াকিদির বর্ণনায় যা সুস্পষ্ট, তা হলো - 'বুনানা" নামের বনি কুরাইজার সেই মহিলাটিকে হত্যা করেছিলেন মুহাম্মদ স্বয়ং।

মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের ওপরে উল্লেখিত বর্ণনায় যে-বিষয়টি সুস্পষ্ট, তা হলো - যখন বনি কুরাইজার লোকদেরকে বন্দী অবস্থায় হত্যার উদ্দেশ্যে মুহাম্মদের কাছে দলে দলে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখনও পর্যন্ত তাঁরা জানতেন না যে, ধরে নিয়ে গিয়ে তাঁদেরকে কী করা হচ্ছে। তাঁরা তাঁদের গোত্র নেতা কাব বিন আসাদকে জিজ্ঞাসা করে জানতে চাচ্ছেন, তাদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে কী করা হবে।

প্রতি উত্তরে কাব বিন আসাদের জবাব ছিল, “তোমরা কি দেখছো না যে, তলবকারীরা কখনো তলব থামাচ্ছে না ও যাদেরকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তারা আর ফিরে আসছে না?" অর্থাৎ তাঁদের সেই প্রশ্নের জবাব কাবেরও জানা ছিল না! তিনি তা জানতে পেরেছেন ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি পর্যালোচনার মাধ্যমে,  

“এর মানে হলো মরণ!"

এই সহজ ব্যাপারটি তার লোকেরা কেন বুঝতে পারছে না, সে কারণেই তাঁর বিরক্তি, "তোমাদের বোধশক্তি কি কখনো হবে না?"
আদি ও বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচিত মুহাম্মদের জীবনীগ্রন্থের ('সিরাত') বনি কুরাইজার উপাখ্যানের বর্ণনায় যে-বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট, তা হলো  পরিবার-পরিজনসহ দুর্গ-মধ্যে মুহাম্মদ ও তাঁর অস্ত্রসজ্জিত অনুসারীদের দ্বারা দীর্ঘ ২৫ দিন যাবত চারদিক থেকে অবরুদ্ধ থাকার পর তাঁরা এতটা অসহায় ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, আত্মসমর্পণের আগে তাঁদের পরিণতির বিষয়ে তাঁরা মুহাম্মদের সাথে কোনোরূপ আপস-আলোচনা (negotiation) করবেন, এমন ক্ষমতা তাঁদের ছিল না (কুরান: ৩৩:২৬)।

এমনই এক অক্ষম, অসহায় ও ভীত-সন্ত্রস্ত প্রতিপক্ষের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর তাঁদের সাথে বহুগুণ শক্তিশালী বিজয়ী মুহাম্মদ (মুহাম্মদের সশস্ত্র সৈন্যসংখ্যা তিন হাজার, আর বনি-কুরাইজার প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সংখ্যা ৬০০-৯০০জন) আলাপ-আলোচনা করে "বনি-কুরাইজার অনুরোধে এক মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করেছিলেন", এমন উদ্ভট দাবি আরব্য উপন্যাসের কল্পকাহিনীকেও হার মানায়!
“ভুললে চলবে না, তাঁরা ছিলেন নির্দোষ!”

বনি কুরাইজার বিরুদ্ধে মুহাম্মদের এই আক্রমণটি ছিল "জিবরাইলের অজুহাতে" [পর্ব-৮৭] এবং যে-অজুহাতে মুহাম্মদ তাঁদেরকে অভিযুক্ত করেছিলেন তার সপক্ষে সুনির্দিষ্ট একটি প্রমাণও কোথাও পরিলক্ষিত হয়নি! [পর্ব: ৭৭-৮৬]! ধারণা করা কঠিন নয় যে, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মুহাম্মদ নিজেও তা জানতেন। আর সেই কারণেই তিনি তাঁর আক্রমণের অজুহাত জিবরাইল-এর পর ন্যস্ত করেছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে আরোপিত অভিযোগের যদি সুনির্দিষ্ট একটি প্রমাণও মুহাম্মদের গোচরে থাকতো, তবে তাঁকে আর অশরীরী জিবরাইলের অজুহাতের আশ্রয় নিতে হতো না।

এই একই দৃশ্য আমরা অবলোকন করেছি বনি নাদির গোত্রের বিতাড়িত করার উপাখ্যানের বর্ণনায় (পর্ব: ৫২ ও ৭৫); তাঁদের বিরুদ্ধে আরোপিত অজুহাতেরও "সুনির্দিষ্ট একটি প্রমাণও মুহাম্মদের গোচরে ছিল না” সে কারণেই সেখানেও মুহাম্মদকে চতুরতার মাধ্যমে জিবরাইলের আশ্রয় নিতে হয়েছিল।

অপরপক্ষে, বনি কেইনুকা গোত্রকে উচ্ছেদের ঘটনায় মুহাম্মদ কোনো জিবরাইলের অজুহাতের আশ্রয় নেননি (পর্ব: ৫১); কারণ সেই ঘটনায় একটি সুনির্দিষ্ট অজুহাত মুহাম্মদের গোচরে ছিল, যাকে ইস্যু করে মুহাম্মদ তাঁদেরকে বিতাড়িত করেছিলেন। জিবরাইলের আশ্রয়ের তখন তাঁর কোনো প্রয়োজনই ছিল না।

পাঠক, কল্পনা করুন!

“একজন স্বঘোষিত নবী বাজারের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে সেই গর্ত পাশে বসে আছেন। তাঁর হুকুমে তাঁর অনুসারীরা একটি গোত্রের ৬০০- ৯০০ জন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ সদস্যদের বন্দী অবস্থায় দলে দলে গর্তের পাশে ধরে নিয়ে আসছে। তারপর এক এক করে তাঁদের "কল্লা কেটে" ফেলা হচ্ছে ও তাঁদের সেই বিচ্ছিন্ন মস্তক ও মৃতদেহ সেই গর্তের মধ্যে নিক্ষেপ করা হচ্ছে! তিনি সারাদিন ধরে সেই দৃশ্য অবলোকন করছেন!  
একই সাথে নিহতের পরিবারের সমস্ত মহিলাকে "যৌনদাসী" হিসাবে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা করছেন ধর্ষণ, তাঁদের সন্তানদের "দাস হিসাবে" নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন, তাঁদের সমস্ত সম্পত্তি করছেন লুট ও ভাগাভাগি। আর এই কর্মের ন্যায্যতার সপক্ষে “নবী” তাঁর অনুসারীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করছেন,

‘এটিই ছিল তাঁর আল্লাহর রায়!’"

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় আদি উৎসের বর্ণনার বাংলা অনুবাদের সাথে মূল ইংরেজি অনুবাদের অংশটিও সংযুক্ত করছি।]

The resumption of the narratives of Muhammad Ibne Ishaq (704-768 AD):

Then they surrendered, and the apostle confined them in Medina in the quarter of d. al-Harith, a woman of B. al-Najjar.

Then the apostle went out to the market of Medina (which is still its market today) and dug trenches in it. Then he sent for them and struck off their heads in those trenches as they were brought out to him in batches.

Among them was the enemy of Allah Huyayy b. Akhtab and Ka'b b. Asad their chief. There were 600 or 700 in all, though some put the figure as high as 800 or 900. As they were being taken out in batches to the apostle they asked Ka'b what he thought would be done with them. He replied, 'Will you never understand? Don't you see that the summoner never stops and those who are taken away do not return? By Allah it is death!' This went on until the apostle made an end of them.

Huyayy was brought out wearing a flowered robe (Tabari: ‘rose colored suit of cloths’) in which he had made holes about the size of the finger-tips in every part so that it should not be taken from him as spoil, (A variant 'so that none should wear it after him' is worth mention.) with his hands bound to his neck by a rope.

When he saw the apostle he said, 'By God, I do not blame myself for opposing you, but he who forsakes God will be forsaken.' Then he went to the men and said, 'God's command is right. A book and a decree, and massacre have been written against the Sons of Israel.' Then he sat down and his head was struck off. ----

Muhammad b. Ja'far b. al-Zubayr [3] told me from 'Urwa b. al-Zubayr that 'A'isha said: 'Only one of their women was killed. She was actually with me and was talking with me and laughing immoderately as the apostle was killing her men in the market when suddenly an unseen voice called her name. 'Good heavens,' I cried, 'what is the matter?'

'I am to be killed,' she replied. 'What for?' I asked. 'Because of something I did,' she answered. She was taken away and beheaded.' A'isha used to say, 'I shall never forget my wonder at her good spirits and her loud laughter when all the time she knew that she would be killed' [4]

Al-Tabari (839-923 AD) added:

‘According to Ibn Ishaq, the conquest of the Banu Qurayzah took place in the month of Dhu al-Qadah [5] or in the beginning of Dhu al-Hijjah. Al-Waqidi, however, has said that the Messenger of God attacked them a few days before the end of Dhu Al-Qadah. He asserted that the Messenger of God commanded that the furrows should be dug in the ground of the Banu Qrayza. Then he sat down, and Ali and al-Zubayr began cutting off their heads in his presence. He asserts that the woman whom the prophet killed that day was named Bunanah, the wife of al-Hakam al-Qurazi - it was she who had killed Khallad b Suwayd by throwing a mill-stone on him.

The messenger of God called for her and beheaded her in retaliation for Khallad b Suwad.’ [6] [7]
Sunnah Abu Dawud: Hadith Number 2665
Narated By 'Aisha, Ummul Mu'minin: No woman of Banu Qurayzah was killed except one. She was with me, talking and laughing on her back and belly (extremely), while the Apostle of Allah (pbuh) was killing her people with the swords. Suddenly a man called her name: Where is so-and-so? She said: I. I asked: What is the matter with you? She said: I did a new act. She said: The man took her and beheaded her. She said: I will not forget that she was laughing extremely although she knew that she would be killed. [8]

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] “সিরাত রসুল আল্লাহ”- লেখক: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ খৃষ্টাব্দ), সম্পাদনা: ইবনে হিশাম (মৃত্যু ৮৩৩ খৃষ্টাব্দ), ইংরেজি অনুবাদ:  A. GUILLAUME, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, করাচী, ১৯৫৫, ISBN 0-19-636033-1, পৃষ্ঠা ৪৬৪-৪৬৫

[2] “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী (৮৩৮-৯২৩ খৃষ্টাব্দ), ভলুউম ৮, ইংরেজী অনুবাদ: Michael Fishbein, University of California, Los Angeles, নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৮৭, ISBN 0-7914-3150—9 (pbk), পৃষ্ঠা (Leiden) ১৪৯৩-১৪৯৫ 

[3] মুহাম্মদ বিন জাফর আল-যুবায়ের ৭২৮-৭২৯ (হিজরি ১১০ সাল) সালে মৃত্যুবরণ করেন।

[4] Ibid “সিরাত রসুল আল্লাহ, ইবনে হিশামের নোট- নম্বর ৭১১, পৃষ্ঠা ৭৬৫
"এই সেই মহিলা যে জাঁতা নিক্ষেপ করে খাললাদ বিন সুয়ায়েদ (Khallad b Suwayd) কে হত্যা করেছিল।"

[5] হিজরি ৫ সালের জিলকদ মাস শুরু হয়েছিল ২৪ শে মার্চ, ৬২৭ সাল।

[6] Ibid, “তারিক আল রসুল ওয়াল মুলুক”- লেখক: আল-তাবারী, পৃষ্ঠা (Leiden) ১৪৯৯-১৫০০

[7] আল-ওয়াকিদি (৭৪৮-৮২২ সাল)
‘তিনি ছিলেন প্রথম দিকের এক মুসলিম ঐতিহাসিক ও হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর জীবনী লেখক। তিনি খলিফা হারুন আল-রসিদ ও আল-মামুন এর শাসন আমলে তাঁদের দরবারের বিচারক (কাজী) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর লিখিত ইতিহাস বইগুলো হলো সবচেয়ে প্রথম দিকের (earliest) ও সবচেয়ে বিস্তারিত (detail) ইসলামের ইতিহাস, যা মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের “সিরাত রসুল আল্লাহ”- এর গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত সংযোজন। তিনি ছিলেন মুহাম্মদের সামরিক অভিযান (Military campaigns) বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। বলা হয়, তিনি মোট ২১ টি বই লিখেছিলেন, যার মধ্যে একমাত্র "কিতাব আল-মাগাজি (Kitab al-Maghazi)” বইটিই টিকে আছে।’ তিনি ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের আর এক বিখ্যাত ঐতিহাসিক ও "কিতাব আল-তাবাকাত আল-কাবির" বইয়ের লেখক মুহাম্মদ ইবনে সা'দ (৭৮৪-৮৪৫ খৃষ্টাব্দ) এর শিক্ষক। http://www.britannica.com/biography/al-Waqidi

[8] সুন্নাহ আবু দাউদ, হাদিস নং ২৬৬৫

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন