৮ ডিসেম্বর, ২০১৫

ভণ্ড জাকির নায়েকের ভণ্ডামি: পর্ব দুই (দ্বিতীয় অংশ)

লিখেছেন ডঃ চ্যালেঞ্জ নায়েক


বরং এই আয়াতটি দিয়ে বুঝানো হয়েছে রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র নিজ নিজ পথে ভ্রমণ করে এবং সূর্য ও চন্দ্রের মত রাত-দিনও নিজ নিজ কক্ষপথে চলে। যদি সূর্য ও চন্দ্রের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কক্ষপথ ধরা হয়, তবে রাত-দিনেরও আলাদা আলাদা কক্ষপথ ধরে নিতে হবে। কারণ রাত ও দিনের ক্ষেত্রেও সূর্য ও চন্দ্রের মত নিজ নিজ কক্ষপথের কথা কুরআনে বলা হয়েছে। কুরআন মতে সূর্য ও চন্দ্রের মত রাত-দিনও আলাদা আলাদা কক্ষপথে চলে বা বিচরণ করে। কিন্তু বিজ্ঞান আমাদের বলে, রাত-দিনের কোনো আলাদা কক্ষপথ নেই। রাত-দিন চলেও না। রাত-দিন সব সময়ই স্থির থাকে। কিন্তু কুরআন বলছে, রাত-দিনও সূর্য ও চন্দ্রের মত বিচরণশীল থাকে। অর্থাৎ কুরআন ভুল কথা বলেছে।

জাকির নায়েক এই আয়াতটিকে ভুল ভাবে উপস্থাপন করে মানুষের সাথে প্রতারণা করেছে। এরপর জাকির নায়েক সূরা ইয়াসিন-এর ৪০ নাম্বার আয়াতটির কথা উল্লেখ করেছে। প্রকৃত আয়াতটি হলো: "সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা; এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে চলছে।"

এই আয়াতটিতে বলা হয়েছে সূর্যের পক্ষে চাঁদের নাগাল পাওয়া সম্ভব নয় এবং রাত দিনকে অতিক্রম করতে পারে না। এবং এরা সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে চলছে। অর্থাৎ সূর্য চাঁদের নাগাল পায় না এবং রাতও দিনকে ডিঙ্গিয়ে আগে চলে যায় না। এই আয়াতটিতে সূর্যের দ্বারা চাঁদকে ধরে ফেলার কথা বলা হয়েছে। ব্যাপারটা এমন যে, সূর্য আর চাঁদ একই পথে প্রতিযোগিতা করছে, কিন্তু সূর্য চাঁদকে ধরতে পারছে না বা নাগাল পাচ্ছে না। কিন্তু আমরা জানি, সূর্যের কাছে পৃথিবীসহ সব গ্রহ-উপগ্রহ নাগালের মধ্যেই রয়েছে। আর এই নাগালের নাম মহাকর্ষ শক্তি। সূর্য পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ এবং চাঁদসহ সব উপগ্রহকে নাগালের মধ্যেই ধরে রেখেছে। কিন্তু কুরআন বলছে, সূর্যের পক্ষে চন্দ্রের নাগাল পাওয়া সম্ভাব নয়। অর্থাৎ কুরআন ভুল কথা বলেছে। কুরআন এখানে বুঝিয়েছে. সূর্য ও চন্দ্র একই কক্ষপথে বিচরণ করে, কিন্তু সূর্য চন্দ্রের নাগাল পায় না। সূর্য আর চন্দ্রের কক্ষপথ সম্পূর্ণ আলাদা, তাই একটা আরেকটাকে ধরে ফেলা বা একটা আরেকটার নাগাল পাওয়ার কথা বলা অর্থহীন। এখানে এজন্যই সূর্যের চাঁদকে নাগালে পাওয়ার কথা বলা হয়েছে কারণ সূর্য ও চন্দ্রকে একই কক্ষপথে কল্পনা করা হয়েছে, কিন্তু তবুও সূর্য চন্দ্রকে নাগালে পাচ্ছে না বলে এই কথাটি বলা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআন সব দিক থেকেই ভুল কথা বলেছে।

আর জাকির নায়েক কথার প্যাঁচে মিথ্যাকে সত্য বানাতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। এরপর জাকির নায়েক সূরা ইয়াসিন-এর ৪০ নাম্বার আয়াতটি উল্লেখ করেছে। প্রকৃত আয়াতটি হলো: "এবং সূর্য ভ্রমণ করে ওর নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এটা পরাক্রমশালি, সর্বাজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।"

এই আয়াতে বলা হয়েছে সূর্যের একটি নির্দিষ্ট গন্তব্য রয়েছে আর সূর্য সেই নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে ধাবমান থাকে। সূর্য যে ভ্রমণ করে বা গতিশীল থাকে, সেটা আবিষ্কার হয়েছে খুব বেশি দিন আগে নয়। কিন্তু মানুষ সূর্যের প্রকৃত গতিশীলতা কখনই নিজ চোখে দেখতে পারে না। তবে মানুষ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উঠতে দেখে এবং পশ্চিম দিকে ডুবে যেতে দেখে। অর্থাৎ মানুষ নিজের চোখেই সূর্যকে গতিশীল অবস্থায় দেখতে পায়। কিন্তু মানুষের নিজের চোখে দেখা সূর্যের গতিশীলতা আসলে সূর্যের প্রকৃত গতিশীলতা নয়। মানুষ সূর্য ও চন্দ্রকে গতিশীল দেখে পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্য। অর্থাৎ মানুষ সূর্যের যে-গতিশীলতা দেখে সূর্যকে গতিশীল ভাবে, প্রকৃতপক্ষে সেটা সূর্যের আসল গতিশীলতা নয়। মানুষ সূর্যকে এভাবে গতিশীল দেখার কারণ সূর্যের প্রকৃত গতিশীলতা নয়, বরং পৃথিবীর গতিশীলতার জন্য সূর্যের গতিশীলতা অনুভব করে। আর প্রকৃতপক্ষে সূর্য আসলে সেভাবে গতিশীল থাকে না। সূর্যের গতিশীলতা এমন নয় যে, পূর্ব দিক থেকে উঠে পশ্চিম দিকে গমন করে; বরং সূর্যের গতিশীলতা মানুষ নিজের চোখে দেখতে পায় না।

আর তাই কুরআনের এই আয়াতটি বুঝতে হলে আগে জানতে হবে কুরআন এখানে সূর্যের কোন গতিশীলতার কথা বলেছে। মানুষ সূর্যকে যেভাবে গতিশীল প্রত্যক্ষ করে সেটা নাকি সূর্যের প্রকৃত গতিশীলতা, যেটা মানুষ দেখতে পায়না সেটা? এই আয়াতটি থেকে এটা বোঝার কোনো উপায় নেই। কারণ এই আয়াতটি একটি সাধারণ কথা বলেছে, যেটা দিয়ে সূর্যের গতিশীলতা বুঝিয়েছে এবং সূর্যের একটা গন্তব্যের কথা বলেছে। তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, কুরআন সূর্যের গতি বলতে কী বুঝিয়েছে এবং সূর্যের গন্তব্যই বা কোনটি?

এর উত্তর পাওয়া যায় এই আয়াতটির একটা ব্যাখ্যামুলক হাদিসে, যেখানে বলা হয়েছে সূর্যের প্রকৃত গন্তব্যের কথা। হাদিসটিতে স্পষ্ট করে বলা আছে সূর্যের গন্তব্য বলতে কুরআন কী বুঝিয়েছে? হাদিসটি হলো - সহীহ বুখারী, খণ্ড ৪, বই ৫৪, হাদিস ৪২১:

"আবু যর (রাঃ) হতে বর্ণিত: তিনি বলেন, একদা সূর্য অস্ত যাবার সময় রসূল(সাঃ) আমাকে বললেন, "তুমি কি জান সূর্য কোথায় গমন করে?" আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, এটা যায় (ভ্রমণ করে অর্থাত যেতে যেতে) আরশের নিচে পৌছে সিজদা করে এবং পুনরায় উদিত হওয়ার অনুমতি চায় এবং তাকে অনুমতি দেয়া হয়। এবং অচিরেই (এমন এক সময় আসবে) যখন সে প্রায় সেজদা নত হবে কিন্তু তা গৃহীত হবে না এবং নিজস্ব পথে যাত্রা করার অনুমতি চাইবে; কিন্তু আর অনুমতি মিলবে না, (বরং) তাকে নির্দেশ দেয়া হবে, সেই পথেই ফিরে যেতে - যে পথে সে এসেছে। এবং তখন সে পশ্চিম দিকে উদিত হবে। এটাই হলো আল্লাহর তাআলার এই বাণীর মর্ম :- এবং র্সূয ভ্রমণ করে ওর নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এটা পরাক্রমশালী, সর্বাজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। (৩৬:৩৮)"

এই হাদিসটিকে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা আছে যে, সূর্যের নির্দিষ্ট গন্তব্য হলো আল্লাহর আরশের নিচে। এবং এটি পূর্ব দিক থেকে উঠে পশ্চিম দিকে অস্ত যায়। এবং এরপর এটি আল্লাহর আরশের নিচে আশ্রয় নেয়। কিন্তু একদিন আসবে যখন তাকে যে দিক থেকে এসেছে, সেদিকে ফিরে যেতে বলা হবে। তখনই সে পশ্চিম দিক থেকে উদয় হবে এবং তখন কেয়ামত হবে।

অর্থাৎ স্পষ্টতই এখানে সূর্যের পৃথিবীর চারদিকে ভ্রমণের কথা বলা হয়েছে। সূর্যের প্রকৃত গতিশীলতা মানুষ দেখতে পায় না। কিন্তু পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্য সূর্যকে পৃথিবীর চারপাশে (পূর্ব থেকে পশ্চিমে) ঘুরতে দেখে। কিন্তু সেটা প্রকৃত সূর্যের গতিশীলতা নয়। এটি পৃথিবীর আহ্নিক গতির কারণে সৃষ্টি হওয়া একটা ভুল প্রতিচ্ছবি যেটা মানুষ প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু সূর্যের প্রকৃত গতিশীলতা মানুষের পক্ষে নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয় না। তাই কুরআনেও সূর্যের প্রকৃত গতিশীলতার কথা বলা হয়নি। এখানে পৃথিবীর আহ্নিক গতির জন্য মানুষ সূর্যের যে গতিশীলতা প্রত্যক্ষ করে, সেটার কথাই বলা হয়েছে। আর তাই এই আয়াতটির ব্যাখ্যাকারী হাদিসটিতে সূর্যের পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে অস্ত যাবার কথা বলা হয়েছে এবং এটির গন্তব্য হিসেবে দেখিয়েছে আল্লাহর আরশের নিচে। অর্থাৎ কুরআনে সূর্যের গন্তব্য বলতে আল্লাহর আরশের নিচের স্থানকে বুঝিয়েছে।

কিন্তু আমরা জানি সূর্যের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থল নেই। সূর্য আমাদের গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত গতিশীল রয়েছে। অর্থাৎ অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ যেভাবে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে বা প্রদক্ষিণ করে, ঠিক সেভাবেই সূর্য গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে সব সময়ই ঘূর্ণায়মান থাকে এবং এটির কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যস্থল নেই। অর্থাৎ কুরআন এখানে সম্পূর্ণ ভুল কথা বলেছে। আর জাকির নায়েক সেই ভুল কথাটিকে বিজ্ঞান বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছে। এর জন্য কিছু প্রতারণামূলক কথা তাকে বলতে হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন