২ ডিসেম্বর, ২০১৫

লওহে মাহফুজের সন্ধানে: ক্যাটম্যান সিরিজ - ০৪

লিখেছেন ক্যাটম্যান

মুক্তচিন্তা চর্চা, প্রচার ও প্রসারের কারণে ধর্মান্ধ মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীর নৃশংস হামলার শিকার হুমায়ুন আজাদ, রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় ও ফয়সল আরেফিন দীপন সহ নিহত ও আহত সকল মুক্তচিন্তকের স্মরণে এই লেখাটি অপরিমেয় ভালোবাসার স্মারক স্বরূপ নিবেদন করছি।


এখন আমরা দেখবো তৃতীয় দিনে মূসার পরমেশ্বর কীভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটালেন।
তৃতীয় দিনে ভোর হতেই শোনা গেল বজ্রধ্বনি, দেখা গেল বিদ্যুত-ঝলক, পর্বতের উপরে নিবিড় মেঘ উপস্থিত হল, বেজে উঠল দীর্ঘতম তুরিধ্বনি: শিবিরের সমস্ত লোক কাঁপতে লাগল। মোশী লোক সকলকে শিবিরের মধ্য থেকে পরমেশ্বরের দিকে নিয়ে গেলেন, আর তারা পর্বতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে রইল। সিনাই পর্বত সম্পূর্ণই ধূমময় ছিল, কেননা প্রভু তার উপরে আগুনের মধ্যেই নেমে এসেছিলেন, আর তার ধূম অগ্নিকুণ্ডের ধূমের মত ঊর্ধ্বে উঠছিল আর সমস্ত পর্বত প্রচন্ড ভাবে কাঁপছিল। তুরিধ্বনির শব্দ তীব্রতম হতে হতে মোশী কথা বলছিলেন ও পরমেশ্বর এক কন্ঠস্বরের মধ্য দিয়ে উত্তর দিচ্ছিলেন। প্রভু সিনাই পর্বতের উপরে, পর্বতচূড়ায়, নেমে এলেন, এবং প্রভু মোশীকে সেই পর্বতচূড়ায় ডাকলেন; আর মোশী আরোহন করলেন। [যাত্রাপুস্তক ১৯:১৬-২০]
আলোচ্য শ্লোকসমূহের শুরুতেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, ঈশ্বরের সাংকেতিক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন বিষয়ের আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে যেমন - মেঘ, আগুন ও ধূম ইত্যাদি। এ বিষয়ে বাইবেলের সংশ্লিষ্ট শ্লোকসমূহ বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, ইস্রায়েলের জনগণের নিকট মূসার পরমেশ্বরকে হাজির করতে মূসাকে তেমন বেগ পেতে হয়নি। কারণ ঈশ্বরকে হাজির করার এমন এক সুচারু ও সহজসাধ্য নকশা প্রণয়ন করেন মূসা, তাতেই ইস্রায়েলের জনগণ বোকা বনে যায়। আর এর সুবাদে ইস্রায়েল জাতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবার লক্ষ্যে মূসার প্রণীত জাতিয়তাবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ মসৃণতা পায়। 

মূসার পরমেশ্বর ইস্রায়েলের জনগণের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ বা যোগাযোগ স্থাপনে অনাগ্রহী, পাছে সাধারণ জনগণের অমঙ্গল হয় সেই আশঙ্কায়। তারা যেন মৃত্যুঝুঁকিতে না পড়ে, সেজন্য তাদেরকে পরমেশ্বরের অবস্থান থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। একইসাথে তাদেরকে দূর থেকে পরমেশ্বরের উপস্থিতির কিছু লক্ষণ বা সাংকেতিক চিহ্ন দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। সেক্ষেত্রে মূসার পরমেশ্বর পর্বতের চূড়ায় আগুনের মধ্যে নেমে এলেন। প্রাকৃতিক নিয়মানুযায়ী আমরা জানি, যেখানে ধোঁয়া বিদ্যমান, সেখানে আগুনের উপস্থিতি রয়েছে বা ছিলো, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। মূসার পরমেশ্বর মূসার জনগণের নিকট নিজেকে প্রকাশ করার প্রয়োজনে আগুন ও ধোঁয়াকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কারণ আগুন শক্তির ও ধোঁয়া রহস্যময়তার প্রতীক। মূসার পরমেশ্বর মূলত এই দুটি প্রতীকের কাঁধে ভর করে স্বীয় শক্তি ও রহস্যময়তার ইঙ্গিত জানাতে চেয়েছেন ইস্রায়েলের জনগণকে। বস্তুত সিনাই পর্বতের চূড়ায় সেদিন কোনও পরমেশ্বরের অবতরণ ঘটেনি। সুচতুর মূসা সিনাই পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত ঝোপঝাড়ে অগ্নি সংযোগ করে কৃত্রিমভাবে আগুনের সূত্রপাত ঘটান। আর সেই আগুন থেকে উদ্ভুত ধোঁয়াকে পরমেশ্বরের উপস্থিতি বলে চালিয়ে দিয়েছেন মূসা।

বাইবেলের একাধিক শ্লোকে এই অগ্নি-ধূমময় ঈশ্বরের বর্ণনা রয়েছে।
যখন তোমরা অন্ধকারের মধ্য থেকে সেই কন্ঠ শুনতে পেলে আর ইতিমধ্যে গোটা পর্বতটাই আগুনে জ্বলছিল - তখন তোমাদের গোষ্ঠী-নেতারা ও প্রবীণবর্গ সকলে আমার কাছে এসে বলল, এই যে, আমাদের পরমেশ্বর প্রভু আমাদের কাছে তাঁর গৌরব ও মহত্ব ব্যক্ত করেছেন আর আমরা আগুনের মধ্য থেকে তাঁর কন্ঠ শুনতে পেলাম: মানুষের সঙ্গে পরমেশ্বর কথা বললেও মানুষ বাঁচতে পারে, এ আমরা আজ দেখলাম। [দ্বিতীয় বিবরণ ৫:২৩-২৪]
কিন্তু মূসার অগ্নি-ধূমময় পরমেশ্বর সিনাই পর্বতচূড়ায় অবতীর্ণ হয়ে মূসাকে প্রথমেই যে বিষয়ে তাগাদা দেন, তা আর নতুন কিছু নয়, মূলত তা ছিল পরমেশ্বরের অতি গোপনীয় স্বরূপ রক্ষায় অতি সাবধানী ও ভীরুতাসূচক প্রয়াস। 
প্রভু মোশীকে বললেন, ‘নেমে যাও, ও লোকদের সনির্বন্ধ আবেদন জানাও, দেখবার জন্য তারা যেন সীমা লঙ্ঘন করে প্রভুর দিকে না ছুটে আসে, পাছে বহুলোকের বিনাশ ঘটে। যাজকেরা, যারা প্রভুর কাছে এগিয়ে আসে, তারাও নিজেদের পবিত্রিত করুক, পাছে প্রভু তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।’ মোশী প্রভুকে বললেন, ‘জনগণ সিনাই পর্বতে উঠে আসতে পারে না, কারণ তুমি নিজেই তো কড়া আদেশ দিয়ে আমাদের বলেছিলে, পর্বতের সীমা স্থির কর, ও তা পবিত্র বলে ঘোষণা কর। ’ প্রভু তাঁকে বললেন, ‘যাও, এবার নেমে যাও; পরে আরোনকে সঙ্গে করে আবার উঠে এসো; কিন্তু যাজকেরা ও জনগণ প্রভুর কাছে উঠে আসবার জন্য যেন সীমা লঙ্ঘন না করে, পাছে তিনি তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। ’ মোশী লোকদের কাছে নেমে গিয়ে কথা বললেন। [যাত্রাপুস্তক ১৯:২১-২৫]
তিনদিন আগেও মূসাকে গোপনীয়তা বজায় রাখার নির্দেশনা প্রদান করেও স্বস্তি লাভ করতে পারেননি। মূসার পরমেশ্বর এমন এক সত্তা, যিনি স্বীয় সৃষ্ট জনগণকে ভয় পান, যেন তাদের সামনে তার স্বরূপ প্রকাশ না হয়ে পড়ে। ইস্রায়েলের জনগণকে নিয়ন্ত্রণে অক্ষম বিধায় মূসাকে বারংবার তাগাদা প্রদান করছেন, যেন তারা সিনাই পর্বতে আরোহন করে পরমেশ্বরের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ না করে। নিজের দুশ্চিন্তা ব্যক্ত করে তিনি প্রথমেই মূসাকে দায়িত্ব দেন ইস্রায়েলের জনগণকে সামলানোর। তারা যেন পরমেশ্বরকে দেখতে সিনাই পর্বতের চূড়ায় ছুটে না আসে। নিরাপত্তা সংকটগ্রস্ত পরমেশ্বরকে মূসা বাধ্য হয়ে অভয় দান করেন এবং এই মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, ইস্রায়েলের জনগণ সীমালঙ্ঘন করে পর্বতে উঠে আসতে পারে না। কারণ তিনদিন পূর্বেই পরমেশ্বর এ বিষয়ে মূসাকে যে নির্দেশনা প্রদান করেছেন, হয়ত তা পরমেশ্বরের এখন স্মরণে নেই। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী মূসা তার জনগণকে পূর্বেই দীক্ষিত করেছেন। বিধায় উক্ত বিষয়ে পুনরায় নির্দেশনা প্রদানের কোনও প্রয়োজন নেই। 

এক্ষেত্রে আমাদের বুঝতে আর বাকী থাকে না যে, মূসার পরমেশ্বর ক্ষীণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ভীরু ও বর্ণচোরা প্রকৃতির মুখোশাবৃত সত্তা। মূসার পরমেশ্বর বলে আদৌ কেউ আছে কি না, এমন যৌক্তিক প্রশ্ন বারবার উত্থাপনের জন্য উপরোক্ত শ্লোকসমূহ যথেষ্ট উপাত্ত বহন করে। মূসার নিকট থেকে অভয় ও সান্ত্বনা পেয়ে পরমেশ্বর মূসাকে ইস্রায়েলের যাজক ও জনগণকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র তার ভাই হারুনকে নিয়ে পাহাড়ে ওঠার অনুমতি দেন, যা নগ্ন স্বজনপ্রীতির সামিল।

(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন