১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫

ভণ্ড জাকির নায়েকের ভণ্ডামি: পর্ব দুই (তৃতীয় অংশ)

লিখেছেন ডঃ চ্যালেঞ্জ নায়েক


এরপর জাকির নায়েক সূরা রাদের ০২ নাম্বার, সূরা ফাতির ১৩ নাম্বার, সূরা লোকমানের ২৯ নাম্বার, এবং সূরা আল যুমার ০৫ নাম্বার আয়াতের কথা উল্লেখ করে দাবি করেছে - সেখানে বলা হয়েছে, সূর্য এবং চন্দ্র প্রত্যেকেই পরিভ্রমণ করে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত। ওই আয়াতগুলোতে বলা আছে, "আল্লাহ সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মাধীন করেছেন, প্রত্যেকে পরিভ্রমণ করে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত।" অর্থাৎ সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মের মধ্যে রাখা হয়েছে। আর তারা একটি নির্দিষ্টকাল বা সময় পর্যন্তই পরিভ্রমণ করে। তাহলে প্রশ্ন হলো: বাকি সময় তারা কী করে? অর্থাৎ সেই নির্দিষ্টকালটা শেষ হলে সূর্য ও চন্দ্র কোথায় যায়? কুরআনের এই আয়াতগুলোতে বলা হচ্ছে সূর্য ও চন্দ্র একটা নির্দিষ্টকাল পর্যন্তই পরিভ্রমন করে বা ভ্রমনরত থাকে বলা হলেও সেই নির্দিষ্টকাল বা সময়টা যখন শেষ হয়, তখন তারা কী করে, সেটা কুরআনে উল্লেখ করা নেই। এটি বর্ণনা করা আছে সেই হাদিসটিতে, যেখান সূর্য অস্ত যাবার পরে আল্লাহর আরশের নিচে যায় বলে মুহাম্মদ বলেছিল। সহী বুখারির খণ্ড ৪, বই ৫৪, হাদিস ৪২১-এ মুহাম্মদ বলেছে যে, সূর্য অস্ত যাবার পর আল্লাহর আরশের নিচে যেয়ে সেজদা করে। এবং পরের দিন উদয় হবার জন্য অনুমতি চায়। এবং তাকে অনুমতি দেওয়া হলে সে পরের দিন আবার উদিত হয়। অর্থাৎ কুরআনের কথা অনুযায়ী, সূর্য ও চন্দ্র উদয় হওয়া থেকে অস্ত যাওয়া সময় পর্যন্তই পরিভ্রমণ করে। বাকি সময় আল্লাহর আরশের নিচে যেয়ে সেজদারত অবস্থায় থাকে।

কুরআন এখানে সম্পূর্ন ভুল এবং অবৈজ্ঞানিক কথা বলেছে। অর্থাৎ কুরআনের কথা অবাস্তব এবং অবৈজ্ঞানিক। কিন্তু জাকির নায়েক এই অবাস্তব এবং অবৈজ্ঞানিক কথা দিয়েই কুরআনকে বৈজ্ঞানিক বানানোর চেষ্টা করেছে। এজন্য সে অবশ্য একটু প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। এবার জাকির নায়েকের প্রতারণামুলক কথাগুলোকে একটু বিশ্লেষণ করে দেখি, সে কী কী মিথ্যে কথা বলেছে এবং কী কী প্রতারণা করেছে।

জাকির নায়েক প্রথমেই বলেছে, আগেকার দিনে নাকি ইউরোপিয়ানরা মনে করতো যে, পৃথিবী এই বিশ্বজগতের কেন্দ্রে একেবারে স্থির হয়ে বলে আছে এবং বাকি সব গ্রহ-নক্ষত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। জাকির নায়েকের এই কথা বলতে যেয়ে এমন ভাব প্রকাশ করেছে, যেন ইউরোপিয়ানরা ছাড়া বাকি পৃথিবীর সবাই ভিন্ন কথা মনে করতো। জাকির নায়েক নিশ্চয় জানে যে, সারা পৃথিবীর মানুষই (জাকির নায়েকের পূর্বসূরী আরবীয় এবং ভারতীয়রাও) এ কথাই মনে করতো। পৃথিবীর সবাই মনে করতো, পৃথিবীই এই বিশ্বজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত।

জাকির নায়েকের কথাতে প্রতারণাটুকু লক্ষ্য করুন, সে বোঝাতে চেয়েছে যে, আরবীয়রা পৃথিবীকে বিশ্বজগতের কেন্দ্র মনে করতো না। তার প্রতারণামূলক এই বক্তব্যটির উদ্দেশ্য - কুরআনকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ করা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর সব মানুষই মনে করতো যে, পৃথিবী এই বিশ্বজগতের কেন্দ্র এবং সূর্য ও চন্দ্র এবং তারকারা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘোরে। সুতরাং জাকির নায়েকের বলা কথাটি (শুধু) ইউরোপিয়ানরা মনে করতো পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্র কথাটিতে সুক্ষ্ম প্রতারণা রয়েছে। সঠিক কথাটি হবে আগেকার সব মানুষই এমনটি মনে করতো। থিওরী অফ জিওসেন্ট্রিজম (পৃথিবী-কেন্দ্রিক বিশ্বজগত) টলেমির সময় থেকে ১৬০০ শতাব্দি পর্যন্ত সময়ে সারা পৃথিবীর মানুষই বিশ্বাস করতো। আরবীয়রাও, ভারতীয়রাও। সুতরাং এ কথা দাবি করা অর্থহীন যে, ইউরোপিয়ানরাই শুধু মনে করতো পৃথিবী কেন্দ্রিক বিশ্বজগতের কথা। জাকির নায়েকের প্রতারণাটুকু একদম স্পষ্ট।

এরপর জাকির নায়েক বলেছে, "১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দে ইউহান্নেস কেপলাম, তিনি তার বই এস্টোনবিয়া নবিয়াতে লিখেছেন যে, এই সৌরজগতে পৃথিবী আর অন্যান্য গ্রহ শুধু সূর্যের চারপাশে প্রদক্ষিন করে না, তারা নিজ অক্ষের চারপাশেও প্রদক্ষিণ করে।" জোহান্নেস কেপলার-এর বইটির নাম 'এস্ট্রোনমিয়া নোভা', যে-বইটির মাধ্যমেই পৃথিবীর মানুষ জানতে পেরেছে, পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্রে অবস্থিত নয়। বরং পৃথিবীসহ সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ এবং চাঁদ সহ অন্যান্য উপগ্রহ সূর্যের চারপাশে পরিভ্রমণ করে। কুরআন বা অন্যান্য গ্রন্থগুলোর মাধ্যমে কেউ জানতে পারেনি সূর্যকেন্দ্রিক সৌরজগতের কথা। অর্থাৎ এর আগের সব গ্রন্থেই পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বজগতের বর্ণনা দেওয়া আছে। কুরআনেও বিভিন্ন আয়াতে চাঁদ তাঁরা ও সূর্যের ভ্রমণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু পৃথিবীর ভ্রমণের কোনো কথাই বলা হয়নি। অর্থাৎ কুরআন পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্বজগতের কথাই বর্ণনা করেছে।

এরপর জাকির নায়েক দাবি করেছে, সে যখন স্কুলে পড়তো, তখন নাকি সে জেনেছে, পৃথিবীসহ সব গ্রহ-উপগ্রহ সূর্যের চারপাশে ঘোরে এবং তাদের নিজের অক্ষেও ঘোরে। কিন্তু সূর্য নিজের অক্ষে ঘোরে না। জাকির নায়েক যেহেতু প্রচুর মিথ্যে কথা বলে, সুতরাং এটা ধরে নিতে পারি যে, সে এটাও মিথ্যে কথা বলছে। কিন্তু প্রমাণ না পাওয়ায় সেটা নিয়ে কোনো কথা বলবো না। তবে হ্যাঁ, সূর্য পরিভ্রমণ করে না বা সূর্য নড়াচড়া করে না, এটি সত্য কথা। এটা বুঝতে হলে আগে বুঝতে হবে, গতিশীল অবস্থা বলতে বিজ্ঞান কি বোঝে? সাধারণভাবে কোনো কিছুকে গতিশীল দেখলেই তাকে গতিশীল বলা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় গতিশীলতা নির্ণয় করা হয় কোনো একটা বস্তু বা স্থানকে কাঠামো বা সাপেক্ষ ধরে নিয়ে। 

যেমন, দুটো ট্রেন যদি পাশাপাশি একই বেগে গতিশীল থাকে, তবে একটা ট্রেনে দাঁড়ানো যাত্রীর সাপেক্ষে অন্য ট্রেনের বিপরীত যাত্রীটি স্থির আছে ধরে নেওয়া হবে; যদিও উভয়েই পৃথিবীর সাপেক্ষে গতিশীল। ঠিক তেমনিভাবে যদি একটি বাস দশ কিলোমিটার বেগে যায় এবং অপরটি পনের কিলোমিটার বেগে গতিশীল থাকে তবে প্রথম বাসটি অপর বাসটিকে পাঁচ কিলোমিটার বেগে গতিশীল দেখবে। যদিও উভয়টি পৃথিবীর সাপেক্ষে ভিন্ন বেগে গতিশীল রয়েছে। ঠিক তেমনি আমরা চাঁদকে যে-গতিতে বিচরন করতে দেখি চাঁদ আসলে তার থেকে অনেক বেশি গতিশীল থাকে। কারণ পৃথিবী চাঁদকে নিয়ে প্রচণ্ড গতিতে সূর্যের চারপাশে পরিভ্রমণ করে।

ঠিক একইভাবে যখন একটি মানুষ পৃথিবী থেকে সূর্যকে লক্ষ্য করবে তখন সে সূর্যকে স্থির দেখবে। কারণ পৃথিবীর সাপেক্ষে সূর্য সত্যি সত্যিই স্থির। কারণ সূর্য গ্যালাক্সির চারপাশে যখন গতিশীল থাকে তখন পৃথিবীকেও একই বেগে তার সাথে নিয়ে চলে। ফলে একজন গ্যালাক্সির বাইরে থেকে কেউ দেখবে যে সূর্য এবং পৃথিবী দুটোই প্রচণ্ড বেগে গতিশীল রয়েছে। কারণ সে থাকবে শূন্য গতিতে। ফলে সে সূর্য এবং পৃথিবীকে দেখবে সেকেন্ডে ২০০ কিলোমিটার বেগে গতিশীল। কিন্তু পৃথিবীতে দাড়িয়ে একজন দেখবে, সূর্য স্থির। কারণ সূর্য যখন গতিশীল থাকে, তখন পৃথিবীকে সঙ্গে নিয়েই গতিশীল থাকে ফলে পৃথিবীতে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি সূর্যকে স্থির দেখবে। অর্থাৎ পৃথিবীর সাপেক্ষে সূর্য স্থির। এটি এখনও স্থির এবং ভবিষ্যতেও পৃথিবীর সাপেক্ষে স্থিরই থাকবে। আর তাই যখন বলা হবে সূর্য স্থির তখন সেটা বিজ্ঞানের ভাষায় পৃথিবীর সাপেক্ষে স্থির বলে ধরে নিতে হবে। কিন্তু গ্যালাক্সির সাপেক্ষে এক রকমভাবে গতিশীল থাকে এবং বিশ্বজগতের সাপেক্ষে আরেক রকমভাবে গতিশীল থাকে। বিশ্বজগতের সাপেক্ষে গ্যালাক্সি নিজেও প্রচণ্ড গতিতে গতিশীল রয়েছে বলে তখন সূর্যের গতি গ্যালাক্সির সাপেক্ষে যেটা তার থেকে অনেক বেশি হবে। গতিশীলতা নির্ণয় করা হয় কোনো একটি স্থান বা বস্তুকে সাপেক্ষ ধরে নিয়ে। আর তাই পৃথিবী এবং সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের সাপেক্ষে সূর্য এখনও স্থিরই আছে, স্থিরই থাকে।

আধুনিক যুগ আসার আগে মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না গ্যালাক্সির সাপেক্ষে সূর্যের গতিকে পরিমাপ করা। কিন্তু আধুনিক কালে এসে মানুষ গ্যালাক্সির সাপেক্ষে সূর্যের গতিকে পরিমাপ করতে সক্ষম হয়েছে বলে আজ মানুষ জানে সূর্যও গতিশীল। গ্যালাক্সির সাপেক্ষে সূর্যের গতি কত, সেটা মানুষ বিজ্ঞানের জ্ঞান ব্যবহার করে নির্ণয় করতে পেরেছে। কোনো ধর্মীয় জ্ঞান দিয়ে সেটা নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি। আর তাই একশো বছর বা ত্রিশ বছর আগে মানুষ যদি বলে থাকে যে সূর্য স্থির ছিল, তবে তার কথা মিথ্যে হয়ে যাবে না। কারণ পৃথিবীর সাপেক্ষে সূর্য সত্যি সত্যিই স্থির। কিন্তু গ্যালাক্সি বা বিশ্বজগতের সাপেক্ষে সূর্য স্থির নয়; গতিশীল। আর তাই জাকির নায়েক যদি পড়ে থাকে যে, সূর্য স্থির তবে সেটাকে ভুল বলা যাবে না। পৃথিবীর সাপেক্ষে সূর্য এখনও স্থির।

এরপর জাকির নায়েক সূরা আম্বিয়ার ৩৩ নাম্বার আয়াতটি উল্লেখ করে বলেন, সেখানে লেখা আছে, আল্লাহ রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেকটি নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে বা ভ্রমণ করে। জাকির নায়েক আরো বলেছে, এই আয়াতটিতে 'ইয়াজবাহুন' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। 'ইয়াজবাহুন' শব্দটি আরবী 'সাবাহা' শব্দ থেকে এসেছে যেটা দিয়ে কোন চলন্ত বস্তুর গতিকে বোঝায়।

জাকির নায়েকের প্রতারণা বা ভণ্ডামির এটা এক উজ্জ্বল নিদর্শন। সে সব সময় "অমুক শব্দটি তমুক শব্দ থেকে এসেছে, আর তমুখ শব্দটির অর্থ অমুক। তাই অমুকের অর্থ বদলে হয়ে যাবে তমুক" মার্কা উদ্ভট কথা বলে মানুষের সাথে জঘন্যভাবে প্রতারণা করে। কারণ হলো, সে জানে, কুরআনে সম্পূর্ণ ভুল কথা বলা আছে এবং আছে অবাস্তব ও অবৈজ্ঞানিক কথা। আর তাই সে কুরআনের কোনো একটি শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে পুরো আয়াতের অর্থকে বিজ্ঞানের সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ রেখে পরিবর্তন করে দেয় এবং কুরআনকে বিজ্ঞানময় দেখায়। কিন্তু মানুষ তো আর এটা জানে না যে, কুরআনের কোনো একটা শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে কুরআনের আয়াতের অর্থ পরিবর্তন করে কুরআনকে সংশোধন করে বিজ্ঞানময় বানালে সেখানে কুরআনের কোনো ভুমিকাই থাকে না। কারণ কুরআনের ভুলকে ইতিমধ্যে শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে সংশোধন করে দেওয়া হয়ে গেছে। তাহলে কুরআনের কোনো মূল্য থাকবে না। কারণ সেটা মুসলমান দ্বারা সংশোধিত কুরআন; প্রকৃত কুরআন নয়। কারণ প্রকৃত কুরআন ভুল ছিল বলেই মুসলমানরা কুরআনের অর্থ পরিবর্তন করে বিজ্ঞানের সাথে মিলিয়ে নতুন অর্থ করেছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন