১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬

লওহে মাহফুজের সন্ধানে: ক্যাটম্যান সিরিজ - ১৩

লিখেছেন ক্যাটম্যান

মুক্তচিন্তা চর্চা, প্রচার ও প্রসারের কারণে ধর্মান্ধ মৌলবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীর নৃশংস হামলার শিকার হুমায়ুন আজাদ, রাজিব হায়দার, অভিজিৎ রায়, ওয়াশিকুর রহমান বাবু, অনন্ত বিজয় দাশ, নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় নিলয় ও ফয়সল আরেফিন দীপন সহ নিহত ও আহত সকল মুক্তচিন্তকের স্মরণে এই লেখাটি অপরিমেয় ভালোবাসার স্মারক স্বরূপ নিবেদন করছি।


তাছাড়া উল্লিখিত শ্লোকে বর্ণনাকারী পরমেশ্বরের সাথে মূসার সাক্ষাৎকারের বিষয়টি প্রমাণ করতে একটি অতিরিক্ত বর্ণনা যুক্ত করেছেন, তা হলো:
তিনি পর্বত থেকে নেমে আসার সময়ে তাঁর হাতে সেই দু'টো সাক্ষ্যপ্রস্তর ছিল - তখন প্রভুর সঙ্গে কথা বলেছিলেন বিধায় তাঁর মুখের চামড়া যে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, এ বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন না।
প্রভুর সাথে কথা বলার কারণে মূসার মুখমণ্ডল বর্ণনাকারীর নিকট উজ্জ্বল বলে প্রতিভাত হয়েছিল, অথচ সে বিষয়ে স্বয়ং মূসাই সচেতন ছিলেন না। এর দ্বারা প্রমাণিত হয়, উক্ত বর্ণনাটি মূসা বা তার পরমেশ্বরের নয়। মূসার প্রতারণার অনুকূলে এমন বর্ণনা মূসার একান্ত অনুগত কোনো বর্ণনাকারী দিয়ে থাকবেন। কারণ লিখিত প্রস্তরফলক আনার লক্ষ্যে পর্বতচূড়ায় আরোহণের সময় মূসা যাকে পর্বতারোহণের পথ পাহারায় নিযুক্ত করে রেখে গিয়েছিলেন, লিখিত প্রস্তরফলক দু'টি নিয়ে পর্বতচূড়া থেকে নেমে আসার সময়ে মূসার ওই বিশ্বস্ত পাহারাদার মূসার প্রতারণার অনুকূলে উক্ত বর্ণনাটি প্রদান করেছেন, সম্ভবত। যদিও তিনি মূসাকে প্রভুর সাথে কথা বলতে দেখেননি, তবুও তিনি মূসার মুখের চামড়া উজ্জ্বল হয়ে ওঠার পেছনে প্রভুর সাথে কথা বলার কারণ নিহিত আছে বলে কল্পনা করেছিলেন। সম্ভবত, দীর্ঘকালব্যাপী প্রস্তর খোদাই কাজে পরিশ্রান্ত মূসার স্বেদসিক্ত মুখমণ্ডল তুলনামূলকভাবে উজ্জ্বল বলে প্রতিভাত হয়েছিল বর্ণনাকারীর নিকট। অথচ আবেগের আতিশয্যে বর্ণনাকারী সেই বিষয়টিকে পরমেশ্বরের সাথে মূসার সাক্ষাতের নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তাছাড়া প্রস্তরফলক দু'টির দ্বিতীয় সংস্করণে যে-দশ আজ্ঞা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, তা প্রস্তরফলক দুটির প্রথম সংস্করণে লিপিবদ্ধ দশ আজ্ঞার অনুরূপ কি না, সে বিষয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ বিদ্যমান। বিশেষত প্রথম দু'টি আজ্ঞাকে ঘিরে অনুসন্ধিৎসু গবেষকের সন্দেহ যথেষ্ট মাত্রায় ঘনীভূত হওয়ার অবকাশ রয়েছে। কারণ প্রস্তরফলক দু'টির প্রথম সংস্করণে মূলত কী কী আজ্ঞা লিপিবদ্ধ ছিল, বাইবেল অনুযায়ী তা জানার সুযোগ আমাদের নেই। কারণ মূসা যখন প্রস্তরফলক দু'টির প্রথম সংস্করণ নিয়ে পর্বতচূড়া থেকে নেমে ইস্রায়েলের জনগণের নিকট উপস্থিত হয়ে দেখতে পেলেন, তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির সুযোগে ইস্রায়েলের জনগণ বাছুরের মূর্তি নির্মাণ করে তার পূজায় লিপ্ত হয়েছে। তখন মূসা প্রচণ্ড ক্রোধে জ্বলে উঠে নিজ হাতে বহনকৃত প্রস্তরফলক দুটোকে পর্বতের পাদতলে নিক্ষেপ করে ভেঙে ফেলেন। এ বিষয়ে বাইবেলে বর্ণিত হয়েছে:
যোশুয়া লোকদের হইচই শুনে মোশীকে বললেন, ‘শিবিরে কেমন যেন যুদ্ধের শব্দ হচ্ছে।’ কিন্তু তিনি উত্তরে বললেন,
'এ তো জয়ধ্বনির শব্দ নয়,
এ তো পরাজয়ধ্বনির শব্দ নয়;
গান-বাজনারই শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি!'
শিবিরের কাছাকাছি হয়ে যেই দেখলেন সেই বাছুর ও সেই নাচ, ক্রোধে জ্বলে উঠে মোশী নিজের হাত থেকে সেই প্রস্তরফলক দুটোকে নিক্ষেপ করে পর্বতের পাদতলে টুকরো টুকরো করে ভেঙে ফেললেন। [যাত্রাপুস্তক ৩২:১৭-১৯]
এর মাধ্যমে মূসা তার আনীত প্রস্তরফলক দুটোর প্রথম সংস্করণ ইস্রায়েলের জনগণকে দেখানোর পূর্বেই ধ্বংস করে ফেলেন। সেই কারণে মূসার আনীত প্রস্তরফলক দু'টির প্রথম সংস্করণে কী কী আজ্ঞা লিপিবদ্ধ ছিল, ইস্রায়েলের জনগণ তা দেখা ও জানার সুযোগ পাননি। এতে করে এমন ধারণা যৌক্তিক ভিত্তি পায় যে, মূসার আনীত প্রস্তরফলক দু'টির দ্বিতীয় সংস্করণে যে-দশ আজ্ঞা লিপিবদ্ধ ছিল, হয়ত তা প্রস্তরফলক দু'টির প্রথম সংস্করণে হুবহু লিপিবদ্ধ ছিল না। কারণ ইস্রায়েলের জনগণ যখন মূসার পরিকল্পিত পরমেশ্বরের প্রতি আস্থা হারিয়ে বিকল্প ঈশ্বর হিসাবে নিজেদের নির্মিত বাছুরের মূর্তি পূজায় লিপ্ত হয়েছিল, তখন সেই বিদ্রোহাত্মক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মূসা তার পরমেশ্বরের প্রতি ইস্রায়েলের জনগণের আনুগত্য নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েছিলেন। বিধায় নিজের পরিকল্পিত পরমেশ্বরকে অপ্রতিদ্বন্দ্বীসুলভ মর্যাদা আরোপ এবং ইস্রায়েলের জনগণকে মূর্তিপূজা থেকে বিরত রাখার মানসে মূসা তার প্রণীত দশ আজ্ঞায় মৌলিক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, সম্ভবত। কারণ প্রস্তরফলক দু'টির প্রথম সংস্করণে লিপিবদ্ধ দশ আজ্ঞায় একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা ও মূর্তিপূজা প্রতিরোধে স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না হয়ত। তাই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আশু গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হওয়ায় ইস্রায়েলের জনগণের ধর্মীয় অধঃপতনের স্থায়ী প্রতিবিধানকল্পে মূসা তার আনীত দশ আজ্ঞায় একেশ্বরবাদের গুরুত্ব এবং মূর্তিপূজার কুফল বর্ণনা করে প্রাসঙ্গিক আজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনবোধ করেন। আর তা নির্বিঘ্নে করার জন্য মূসার আনীত প্রস্তরফলক দু'টির প্রথম সংস্করণের ধ্বংসসাধন ছিল অনিবার্য। কারণ দুই রকমের দশ আজ্ঞাবিশিষ্ট প্রস্তরফলকের অস্তিত্ব ইস্রায়েলের জনগণকে ঐশ্বরিক আজ্ঞার প্রতি সন্দিহান করে তুলতো। তাই নানাবিধ বিড়ম্বনা এড়াতে এবং প্রস্তরফলক দু'টির দ্বিতীয় সংস্করণ তৈরির পথ সুগম করতে মূসা তার আনীত প্রস্তরফলক দুটির প্রথম সংস্করণ সচেতনভাবে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেন, যেন উক্ত প্রস্তরফলকে লিপিবদ্ধ দশ আজ্ঞা সম্পর্কে ইস্রায়েলের জনগণ কিছু জানতে না পারে।

সেই সুবাদে পরমেশ্বর উপযাচক হয়ে মূসাকে পুনরায় দশ আজ্ঞাবিশিষ্ট দু'টি প্রস্তরফলক প্রদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। অথচ ঐশী আজ্ঞার ফলক ক্রোধবশত ভাঙার অপরাধে মূসাকে তার পরমেশ্বর একবারও জবাবদিহির সম্মুখীন করেননি। এতে করে অনুমিত হয় যে, যদি সত্যিই কোনো পরমেশ্বর মূসার থাকতো এবং সেই পরমেশ্বর মূসাকে উক্ত দশ আজ্ঞাবিশিষ্ট প্রস্তরফলক সত্যিকার অর্থেই যদি প্রদান করতেন, সেক্ষেত্রে মূসা তার জনগণের নৈতিক অধঃপতন দৃষ্টে যতই ক্রুদ্ধ হন না কেন, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে পরমেশ্বর প্রদত্ত ঐশী আজ্ঞাবিশিষ্ট প্রস্তরফলক কিছুতেই ভাঙার ধৃষ্টতা দেখাতেন না। এমন ধৃষ্টতা প্রদর্শনের মূল কারণ এই হতে পারে যে, মূসা ভালোভাবেই জানতেন, যে-পরমেশ্বরের দোহাই তিনি ইস্রায়েলের জনগণকে প্রতিনিয়ত দিয়ে চলেছেন, প্রকৃতপক্ষে সেই পরমেশ্বরের আদৌ অস্তিত্ব নেই। ইস্রায়েলের জনগণের সম্মুখে তিনি মূলত পরমেশ্বর নামের এক মূলা ঝুলিয়ে রেখেছেন। তাই নিজের পরিকল্পিত পরমেশ্বরের নামে যে-দশ আজ্ঞাবিশিষ্ট প্রস্তরফলক তিনি নিজ হাতে তৈরি করে এনেছেন, ক্রোধের বশবর্তী হয়ে তা ভেঙে ফেললেও কোনো সমস্যা হবে না। প্রয়োজনে পুনরায় তা নির্মাণ করবেন বিধায় তা ভেঙে ফেলতে সামান্যতম দ্বিধাবোধ করেননি তিনি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন