১৬ এপ্রিল, ২০১৭

আমাদের মায়েরা

লিখেছেন পুতুল হক

কিছুদিন ধরে দেখছি, পাড়ার মসজিদে এশার নামাজের পর আরবি বর্ণমালা, কোরআন, হাদিস শেখানো হচ্ছে ছেলে-বুড়ো সবাইকে। ঘরে ঘরে জিহাদি বুঝি এবার তৈরি হবেই হবে। 

একটা পরিবারে কোনো সন্তানের মাথায় যখন জিহাদের ভূত চাপে, তখন সে পরিবারের সবার ওপর দিয়ে কী যে দুঃসহ ঝড় যায়, তা আমি কাছ থেকে দেখেছি। আমার একমাত্র চাচাতো ভাই মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে পড়তো। আমিও তখন ছোট। স্বাভাবিকভাবে ছোটবেলা থেকেই মোল্লা টাইপ কথা বলত। মুরুব্বিরা সেসব কথা হেসে উড়িয়ে দিতেন। সে যখন মাত্র ক্লাস ফোরে বা ফাইভে পড়ে, তখন থেকে সে তার মা, বোনদের পোশাক ও চলাফেরার ওপর খবরদারি আরম্ভ করে। 

ছেলে পড়ালেখায় খুবই ভালো, তাই চাচা-চাচী কিছু বলতেন না। বছর বছর তাঁর খবরদারি বাড়ে এবং তা অত্যাচারের পর্যায়ে চলে আসে। চাচাতো বোনদের পোশাক, সাজসজ্জা আর বন্ধুবান্ধব নিয়ে এমন অশালীন কথা বলতে আরম্ভ করলো যে, প্রায়ই সেই সংসারে কান্নাকাটি, ঝগড়া হতে থাকলো। তবুও চাচা-চাচী ছেলেকে কিছু বলেন না, কারণ একমাত্র ছেলে, তদুপরি সাংঘাতিক মেধাবী। আর ছেলে তো দ্বীনের রাস্তাতে আছে, অসুবিধা কী! শীতকালেও ফজরের নামাজ পর্যন্ত মসজিদে জামাতে পড়ে আসে। প্রায় সব নামাজ সে জামাতে আদায় করে। তার ইজতেমা থেকেও ঘুরে আসা হয়ে যায়। 

সবার টনক নড়ে এসএসসি পরীক্ষার আগে যখন সে ঘোষণা দিলো যে, দুনিয়াদারির পড়ালেখা সে আর করবে না। দ্বীন শিক্ষা করবে, দ্বীনের রাস্তায় চলবে। চাচা-চাচীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। আব্বু রোজ বিকেলে চাচার বাসায় যায় ভাতিজাকে বোঝাতে। যেখানে যত আত্মীয়-বন্ধু আছে, সবাইকে খবর দেয়া হয় ছেলেকে বোঝানোর জন্য। কিন্তু তার কথা খুব উগ্র আর ভয়ংকর। পারলে তখনই শহীদ হয়। চাচী বিছানা নিলেন। চাচা কোনোরকমে অফিস করেন। বেশিরভাগ সময় ছেলেকে পাহারা দিতে বাসাতেই থাকেন। 

অনেকের অনেকদিন ধরে বোঝানোর পর সে পরীক্ষা দিতে রাজি হয় এই শর্তে যে, এসএসসি পাশের পর তার পড়ালেখার ব্যাপারে কেউ হস্তক্ষেপ করবে না। চার মাস ব্যাপী ২৪ ঘন্টা আমার কাজিনকে পাহারা দিতে কেউ না কেউ সাথে থাকে। কোনো জামাতি বা হুজুর টাইপের লোকের সাথে তাকে একটা কথাও বলতে দেয়া হয়নি। মসজিদে, মাঠে, কোচিং-এ, যেখানেই গেছে, কেউ না কেউ তার সাথে ছিল। পরীক্ষার পরেই ঢাকার বাইরে বিভিন্ন আত্মীয়দের বাড়িতে তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয়। পাড়ায় এবং স্কুলে যে গ্রুপগুলো তাকে দ্বীনের রাস্তায় আনার মহান দায়িত্ব পালন করেছিল, তাদের সাথে কোন প্রকার যোগাযোগ করতে দেয়া হয় না। 

পরীক্ষার রেজাল্ট বের হলো। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম কুড়ি জনের মধ্যে আমার কাজিন। খুশি খুশি খুশি। তার চিন্তাভাবনার কাজ শুরু করার আগেই তাকে নটরডেম কলেজে ভর্তি করা হলো। কাজিনটা আজও জানে না, তার মা তখনও তাকে কীভাবে পাহারা দিয়ে রেখেছিল। চাচীকে পার না হয়ে বাতাসেরও সাধ্য ছিল না তার ছেলের কাছে যায়। আমার ভাইটা বুয়েট থেকেও ভালো রেজাল্ট করে। জিহাদের ভূত তার মাথাতে আর আসেনি। 

তখন দেখেছি চাচা-চাচী মোহাম্মদ বা আল্লার চাইতে তাদের ছেলেকে বেশি ভালোবাসেন। ধর্মের চাইতে সন্তান বড়। আমার মা-বাবা, চাচা-চাচী, এরা সবাই বাঙালী মুসলমান। নিজেদের কখনো আরবের লোক ভাবেননি। তাদের চলনে-বলনে কখনো আরবীয় সংস্কৃতি ফুটে ওঠেনি। ছেলের কথায় জিহাদি ভাব প্রকাশ পাচ্ছিল, এতেই মায়ের কলিজা ফেটে চৌচির। শহীদ হবার জন্য ছেলের গায়ে বোমা বেঁধে দেয়ার কথা চিন্তাই করা যায় না। 

আমাদের মায়েরা গড়পড়তাভাবে এমনই হয়ে থাকেন। আমাদের নরম মাটি, মিষ্টি জল, হারমোনিয়াম, একতারা, বাঁশি, নতুন গুড়ের ক্ষীর, নতুন চালের পিঠাপুলি, বড়শীর আগায় ছটফট করা তাজা মাছ, সুয়োরাণী-দুয়োরাণী, সূচরাজা, বেহুলা-লক্ষিন্দর, ‌ঈদ-পুজা আমাদের মায়েদের এমনই করে গড়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন