২২ এপ্রিল, ২০১৭

সৌদি আরব কি ইসলামী সন্ত্রাসীদের পক্ষে না বিপক্ষে? - ২

মূল: খালেদ ওলীদ
অনুবাদ: আবুল কাশেম

[ভূমিকা: ডিসেম্বর ও ফেব্রুয়ারি মাসে খালেদ ওলিদের ইসলাম পরিত্যাগের জবানবন্দির ও সৌদি নারীদের অবস্থা অনুবাদ করেছিলাম। তখন লিখেছিলাম, খালেদ আমাকে অনেক ই-মেইলে সৌদি আরাবের ইসলাম সম্পর্কে লিখেছিল। এখানে আমি তার আর একটি লেখা অনুবাদ করে দিলাম। উল্লেখযোগ্য যে, খালেদের এই লেখাটি একটা বইতে প্রকাশ হয়েছে। বইটার টাইটেল হলো: Why We Left Islam. - আবুল কাশেম, এপ্রিল ৪, ২০১০]


এরপর শুরু হতো ইসলামের গৌরবময় অতীত নিয়ে বড়াই করা ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তৃতা। এখন আমি বুঝি যে, এসব করা হতো একমাত্র আমাদের কচি ও সহজে প্রভাবিত মনকে ইসলামী জোশে ভরপুর করার জন্যে, যাতে করে আমরা ইসলামের অতীত বিজয় গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারি। ধর্মীয় শিক্ষকরা তরুণ সমাজকে ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে বিরত থাকার জন্যে নির্দেশ দিতেন; এগুলো হচ্ছে: ধূমপান, পাশ্চাত্যের ধরণে চুল ছাঁটা ও পোশাক পরা, মেয়েলি পোশাক পরা, সঙ্গীত শোনা - বিশেষত পাশ্চাত্য সঙ্গীত, টেলিভিশন উপভোগ করা। এখানে উল্লেখ্য যে, আমাদের মোল্লারা বলত টেলিভিশন দেখা হচ্ছে সব চাইতে বড় পাপ। সত্যি বলতে কি, এ ব্যাপারে একটা ফতোয়া আছে, যাতে বলা হয়েছে যে, যার কাছে স্যাটালাইট অ্যান্টেনা থাকবে, সে বেহেশতে যাবে না। পাশ্চাত্যের অনুকরণে চুল বাঁধা হচ্ছে একেবারে দুর্বিনীত ব্যাবহার। এরই জন্যে আমাদের মাথার চুল ছাঁটা থাকত সামনে এবং পিছনে। সত্যি বলতে কি আমাদের মাঝে যাতে কোন ক্রমেই পাশ্চাত্যের চুল ছাঁটার প্রভাব না পড়ে সে জন্যে আমাদের প্রধান শিক্ষক ব্যক্তিগতভাবে আমাদের প্রত্যেকের মাথা পরীক্ষা করতেন। কেউ যদি চুল কাটার আইন অবজ্ঞা করত, তবে জোরপূর্বক তার মাথার চুল ছেঁটে দেয়া হত বিদ্যালয়ের সেলুনে। এর অর্থ হলো, আমাদের অনেকেরই চুল ছাঁটা হতো 'জিরো' ভাবে - একে বারে ক্রু কাট যাকে বলে। আমাদেরকে তখন দেখলে মনে হত সামরিক বাহিনীর ক্ষুদে সৈনিক - ধর্মীয় বিদ্যালয়ের ছাত্র নয়।

আমাদেরকে সর্বদাই মনে করিয়ে দেয়া হতো মৃত্যু সম্পর্কে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার যে, মৃত্যু হচ্ছে ইসলামের একটি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বক্তৃতা দেওয়া হতো যে, মৃত্যুর কথা মনে করা খুবই পুণ্যের কাজ। এরপর আমাদেরকে বর্ণনা দেওয়া হতো মৃতের দেহের সৎকার (কবর দেওয়া) এবং অন্যান্য অনুসাঙ্গিক বিষয় যা মৃত্যু ও শোককে ঘিরে থাকে। বলতে হয়, আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা সর্বদাই মৃত্যু নিয়ে আবিষ্ট বা মোহাচ্ছন্ন। যারা এই সব মর্মান্তিক বিষয় আমাদের ঐ কোমল মনে মৃত্যুর ধারণা ভাবনা ঢুকিয়ে দেয়, তারা কোনোদিন চিন্তাও করে না, এর কী মারাত্মক প্রভাব পড়ে তরুণ মনে। এই সবের জন্যে আমি প্রায়ই ভাবতাম, আল্লাহ্‌ কী কারণে আমাকে ইহজগতে পাঠালেন, যখন জন্মের সাথে সাথেই আমাকে মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত হতে বলা হচ্ছে। এসবের কী অর্থ হতে পারে - ইসলাম মানেই কি মৃত্যু? আমাদের মনে গভীর ভীতির সঞ্চারের জন্যে সুস্পষ্ট বর্ণনা দেয়া হতো, কবরের ভিতরে আমাদের কী যন্ত্রণাই না পেতে হবে! এর পরিণাম এই হলো যে, কবরের ঐ যন্ত্রণা এড়ানোর জন্য যেসব কাজ মানা করা হয়েছে, আমরা মনে মনে প্রস্তুত হয়ে গেলাম, যে কোনোভাবেই ঐ আদেশ পালনের জন্যে।

এখন যখন আমি ঐ সব দিনগুলির কথা ভাবি, তখন আমার কোনো সন্দেহ থাকে না যে, আমাদের শিক্ষকেরা পরিষ্কার গুল মারতেন আমাদের শিশু মনে ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টির জন্যে, যাতে করে যেমন করেই হোক আমরা ইসলামকে আঁকড়ে থাকব। এই প্রসঙ্গে একটা কালো সাপের গল্প মনে পড়ে গেল। গল্পটা হচ্ছে নিম্নরূপ:

এক ব্যক্তি মারা গেলে তার পরিবার তাকে কবর দেওয়ার জন্যে কবরস্থানে নিয়ে গেল। কবরস্থানে দেখে এক কালো সাপ কবরের পাশে অবস্থান করছে। তাই তারা অন্য একটি কবরের কাছে গেল। সেখানেও ঐ একই অবস্থা—একটি কালো সাপ কবরের নিকট বসে আছে। এই ভাবে অনেক ঘোরাঘুরি করে লোকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়ল। এরপর মরিয়া হয়ে ঐ কালো সাপকে উপেক্ষা করেই তারা মৃত লোকটিকে কবর দিয়ে দিল। কিন্তু যেই তারা ফিরে যাচ্ছিল, তখনই তারা শুনতে পেলো, কবরের ভেতর থেকে আসছে ভীষণ চিৎকার ও হৈ-হল্লার শব্দ। তারা তৎক্ষণাৎ কবরটি খুঁড়ে ফেলল এবং দেখল ঐ কালো সাপ কেমন করে এঁকে বেঁকে কবরে ঢুকে পড়ে মৃত দেহটিকে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছে যে মৃত ব্যক্তির হাড় ভেঙে গেছে। তখন লোকেরা ঐ মৃতের পিতাকে জিজ্ঞেস করল, "তোমার ছেলে কী করেছিল?" পিতা উত্তর দিল, "আমার ছেলে খারাপ তেমন কিছুই করেনি; শুধুমাত্র ব্যাপার এই যে, সে নিয়মিত নামায পড়ত না।"

এখন আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি যে, আমাদের শিক্ষকেরা ঐ ধরনের প্রচুর মিথ্যা, ভয়ংকরী গল্প শুনিয়েছেন। আজ প্রাপ্তবয়স্কে পৌঁছানোর পর মোল্লাদের ঐ সব আজগুবি গল্পের কথা মনে পড়লে আমার হাসিই আসে। কিন্তু সেদিন তাদের বানানো ভয়ানক গল্পগুলোর প্রতিটি শব্দ আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতাম, যেহেতু তারা ছিল শক্তিশালী ও ধর্মের শিক্ষক। আমরা প্রচণ্ড ভীতি ও আতঙ্কের মাঝে থাকতাম। সর্বত্র আমরা দেখতাম আতঙ্ক, সন্ত্রাস; মৃত্যুভীতি, কবরের যন্ত্রণা, এবং শেষ বিচার দিনের শাস্তির কথায় উদ্বিগ্ন হয়ে আমরা কাঁপতে থাকতাম। এছাড়াও সর্বদা আমাদের মনকে আবিষ্ট করে থাকত কাফের, আল্লাহ্‌র ক্রোধ আক্রোশ, পশ্চিমা বিশ্ব, ইসরাঈল... ইত্যাদি। তখন আমরা ঘুণাক্ষরেও ভাবতাম না যে, ঐ শিক্ষকেরা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলতেন। সর্বত্র আমরা ভীতি ছাড়া কিছুই দেখতাম না। আমাদের চারদিক ঘিরে থাকত সন্ত্রাস, ভীতি ও আতঙ্ক। আমরা আতঙ্কিত থাকতাম এই ভেবে যে, পশ্চিমা বিশ্ব ও ইসরাঈল আমাদেরকে আণবিক বোমা মেরে ধ্বংস করে দেবে। আপনার হয়তো হাসবেন, কিন্তু সত্যি সত্যি বলছি: আমার এক বন্ধুর ছেলে যখনই এরোপ্লেনের শব্দ শোনে, তখনই সে কান্না জুড়ে দেয়। সেই শিশু বয়সী ছেলে মনে করে, এরোপ্লেনের শব্দ মানেই যুদ্ধ্বের শুরু। এই আতঙ্কের রোগ আমাদের প্রত্যকের মনে আজ মজ্জাগত হয়ে গেছে আমাদের ঐ ধর্মীয় শিক্ষকদের জন্যে। আমাদের জন্ম হয় আতঙ্ক নিয়ে, জীবনযাপন করি আতঙ্কের সাথে, এবং মারাও যাই আতঙ্কের ছায়ায়। আমাদের সরকার আমাদেরকে বন্দী করে রেখেছে চিরস্থায়ী আতঙ্ক দিয়ে - এই সর্বগ্রাসী ইসলামী আতঙ্ক থেকে আমাদের মুক্তির কোন পথই নেই।

আমাদের ধর্মীয় শিক্ষকেরা কখনই বিশ্বাস করে না যে, যথাযথ ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দেওয়া সৌদি আরবের ছাত্রদের অনুকুলে। বলা বাহুল্য যে, এই মোল্লারা একেবারেই ভুল পথে রয়েছে। এরা এক মিথ্যা অহমিকা ও ভান করা দম্ভের মোহে আচ্ছন্ন। আমাদের বিদ্যালয়গুলিতে যে মৌলিক ইংরেজি শেখানো হয়, তা নিতান্তই ধোঁকাবাজিতে ভরপুর। সত্যি কথা হলো: ইংরেজি ভাষার পরীক্ষায় চলে অবাধ নকল। আমি আমাদের দেশের শিক্ষকদের সাথে এই নকলের ব্যাপারে প্রচুর আলাপ করেছি। কিন্তু তারা একেবারে নিশ্চিত যে, ইংরেজি শেখা আমাদের জন্য তেমন গুরুত্বের কিছু নয় - আমাদের খুবই গর্বিত হওয়া উচিত আমাদের ভাষার জন্য, যে ভাষায় কোরআন লেখা হয়েছে।

আমাদের শিক্ষানীতির একটা বৈশিষ্ট্য এই যে, মুসলমানদের সাফল্যের প্রশংসা ছাড়া আমরা আর কারো ই প্রশংসা করতে পারি না। অ মুসলিমদের কোন সাফল্যের প্রশংসা করা এক মহাপাপ ও দণ্ডার্হ অপরাধ। আমাদের শিক্ষকেরা সবসময় জিহাদ এবং জিহাদে অংশগ্রহণের ফযিলতের কথা নিয়ে ব্যস্ত। আমাদেরকে বলা হচ্ছে জিহাদিদেরকে মুগ্ধভাবে প্রশংসা করতে ও সর্বতোভাবে তাদেরকে অনুকরণ করতে। আমাদেরকে উদ্দীপ্ত করা হচ্ছে যে, আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য জীবনে একবার হলেও জিহাদে যোগদান করা। এই ব্যাপারে নিম্নের হাদিস প্রায়ই উল্লেখ করা হয়:
আবু হুরায়রা বললেন: আল্লাহর রসুল বলেছেন, "যে কেউ আল্লাহ্‌র সাথে দেখা করবে অথচ তার কাছে জিহাদের কোনো চিহ্ন থাকবে না, সে এক খুঁত নিয়ে আল্লাহ্‌র সাথে সাক্ষাৎ করবে।" (জামি তিরমিজি, ভলুম ৩, হাদিস ১৬৬৬, প্রকাশক: দারুস্‌সালাম,‌ রিয়াদ, সৌদি আরব। অনুবাদ অনুবাদকের)
আমাদের সমাজে যেসব ছাত্র ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করে, তারা সর্বদাই হচ্ছে সর্বোত্তম ছাত্র। এই ছাত্ররা প্রধান শিক্ষক থেকে সাধারণ শিক্ষক পর্যন্ত সবার সম্মান পেয়ে থাকে। এরা তাদের চুল ছাঁটে 'জিরো'তে, পোশাক থাকে 'থোয়াব' এবং প্রায়ই ধর্মীয় পুলিশ হিসাবে চাকুরি করে ওরা যেই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছিল সেই বিদ্যালয়েই। পুরস্কার হিসাবে তারা পায় প্রচুর সুযোগ সুবিধা ও অপরিমেয় সম্মান। এই জন্যেই প্রচুর ছাত্র ধার্মিক হয়, কেননা তারা আকুলভাবে কামনা করে ঐ সব মহার্ঘ ও ঐশ্বর্যবান সুযোগ সুবিধা ও আমোদ প্রমোদের ব্যবস্থা, যা সরকার ও জনগণ ওদেরকে অকুন্ঠভাবে দিয়ে থাকে। মোদ্দা কথায়, সৌদি আরবের ধর্মান্ধ লোকেরা সরকার ও আমজনতা থেকে বিশেষ সম্মান ও পুরস্কার পায়। এদেরকে বলা হয় আল্লাহ্‌র তত্ত্বাবধায়ক।

(চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন